বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয় ১ম সেমিস্টার রাষ্ট্রবিজ্ঞান প্রশ্ন ও উত্তর | VU Pol Science MJ A1 PYQ
Vidyasagar University (VU) UG 1st Semester Political Science Previous Years' Questions & Answers (Major MJ A1)
বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন শিক্ষানীতি (CCFUP - NEP 2020) অনুযায়ী স্নাতক প্রথম সেমিস্টারের রাষ্ট্রবিজ্ঞান (Political Science) জেনারেল মেজর (VU MJ A1 General Major 1st Sem) পরীক্ষার্থীদের জন্য এই পেজটি তৈরি করা হয়েছে। এখানে তোমরা 2023, 2024, এবং 2025 সালের বিগত বছরের সমস্ত পরীক্ষার প্রশ্নপত্র (PYQs) এবং তার সম্পূর্ণ নির্ভুল সমাধান ও নোটস পেয়ে যাবে । পরীক্ষা প্রস্তুতিকে আরও মজবুত করতে এবং ভালো নম্বর পেতে এই প্রশ্ন-উত্তরগুলো নিয়মিত অনুশীলন করতে হবে ।
বিভাগ ক * Group A * প্রতিটি প্রশ্নের মান ২
১. "The End of History and the Last Man" বইটি কে লিখেছেন?
(Who wrote the book "The End of History and the Last Man"?)
উত্তর: বিখ্যাত মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা ১৯৯২ সালে এই বইটি লিখেছেন।
২. প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের যেকোনো দু'টি বৈশিষ্ট্য লেখ।
(Write any two features of direct democracy.)
উত্তর: প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের দুটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো:
প্রথমত, এই ব্যবস্থায় কোনো মধ্যস্থতাকারী বা প্রতিনিধি ছাড়াই নাগরিকরা সরাসরি রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নেন।
দ্বিতীয়ত, গণভোট এবং গণউদ্যোগের মতো প্রত্যক্ষ পদ্ধতির মাধ্যমে জনগণ সরাসরি যেকোনো আইনের পক্ষে বা বিপক্ষে নিজেদের মতামত জানাতে পারে।
৩. রাজনীতি এবং ক্ষমতার মধ্যে সম্পর্ক কী?
(What is the relationship between politics and power?)
উত্তর: রাজনীতি এবং ক্ষমতা একে অপরের পরিপূরক। আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তায় রাজনীতি হলো ক্ষমতা অর্জনের এবং ক্ষমতা প্রয়োগের একটি বাস্তব প্রক্রিয়া। ক্ষমতা ছাড়া রাজনীতি তার সামাজিক লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে পারে না, আর ক্ষমতাকে সামাজিক স্বার্থে বৈধতা ও আইনি রূপ দেওয়ার প্রধান মাধ্যমই হলো রাজনীতি।
৪. জাতি-রাষ্ট্র বলতে কী বোঝ?
(What do you mean by Nation-State?)
উত্তর: যখন একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে বসবাসকারী একটি নির্দিষ্ট জাতি, যাদের ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও একাত্মতার বোধ এক, তারা একটি সার্বভৌম রাজনৈতিক কর্তৃত্ব বা রাষ্ট্র গড়ে তোলে, তখন তাকে জাতি-রাষ্ট্র বলে। যেমন- ভারত, বাংলাদেশ বা ফ্রান্স।
৫. সমতা অর্জনের দুটি প্রধান অন্তরায় বা বাধা উল্লেখ কর।
(Mention two main obstacles or barriers to achieving equality.)
উত্তর: সমতা অর্জনের দুটি প্রধান বাধা হলো:
প্রথমত, অর্থনৈতিক বৈষম্য বা সমাজে সম্পদ ও সুযোগের চরম অসম বণ্টন, যা শ্রেণিভেদ তৈরি করে।
দ্বিতীয়ত, জাতি, ধর্ম, বর্ণ বা লিঙ্গের ভিত্তিতে সমাজে প্রচলিত প্রাচীন কুসংস্কার এবং সামাজিক বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি।
৬ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির (Economic Growth) অবদান রাখে এমন দুটি প্রধান ফ্যাক্টর্স কী কী?
(What are the two main factors that contribute to economic growth?)
উত্তর: অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান দুটি চালিকাশক্তি বা ফ্যাক্টর হলো:
১. মানবসম্পদ বা শ্রম (Human Capital): শ্রমিকদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং কারিগরি প্রশিক্ষণের মান উন্নত করার প্রক্রিয়া। এর ফলে কর্মক্ষম মানুষের দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পায়, যা দেশের সামগ্রিক উৎপাদন বাড়াতে সরাসরি সাহায্য করে।
২. মূলধন গঠন (Capital Accumulation): উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য নতুন কারখানা, আধুনিক যন্ত্রপাতি, প্রযুক্তি এবং রাস্তাঘাট বা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো অবকাঠামোতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা। এটি উৎপাদন ব্যবস্থাকে অনেক বেশি দ্রুত ও গতিশীল করে তোলে।
৭. অর্থনৈতিক উন্নয়নের ওপর বিশ্বায়নের প্রভাব কেমন?
(What is the impact of globalization on economic development?)
উত্তর: অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিশ্বায়নের প্রভাব দ্বিমুখী। ইতিবাচক দিক থেকে এর ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায় এবং নতুন প্রযুক্তির আদান-প্রদান ঘটে। তবে নেতিবাচক দিক থেকে এটি উন্নত দেশগুলোর অর্থনৈতিক আধিপত্য বাড়ায় এবং ধনী ও দরিদ্রের মধ্যকার ব্যবধান আরও বাড়িয়ে দেয়।
৮. নাগরিকের দুটি মৌলিক কর্তব্য কী কী?
(What are the two fundamental duties of a citizen?)
উত্তর: ভারতীয় সংবিধান অনুযায়ী নাগরিকের দুটি প্রধান মৌলিক কর্তব্য বা দায়িত্ব হলো:
প্রথমত, দেশের সংবিধান মেনে চলা এবং জাতীয় পতাকা ও জাতীয় সংগীতের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা।
দ্বিতীয়ত, ভারতের সার্বভৌমত্ব, একতা ও অখণ্ডতা রক্ষা করা এবং তা বজায় রাখা।
বিভাগ খ * Group B * প্রতিটি প্রশ্নের মান ৫
৯. রাজনীতি এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মধ্যে পার্থক্যগুলি কী কী?
(What are the differences between politics and political science?)
উত্তর: সাধারণ অর্থে রাজনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে এক মনে হলেও এদের মধ্যে সূক্ষ্ম ও গভীর পার্থক্য রয়েছে।
প্রথমত, রাজনীতি হলো একটি ব্যবহারিক ও বাস্তব প্রক্রিয়া বা আচরণ। ক্ষমতা লাভ, ক্ষমতার টিকিয়ে রাখা এবং তা প্রয়োগের দৈনন্দিন লড়াই এর অন্তর্ভুক্ত। এর পরিধি অত্যন্ত গতিশীল এবং এটি পরিবর্তনশীল বাস্তব সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ঘটনার ওপর ভিত্তি করে চলে। রাজনৈতিক নেতা, দল এবং সাধারণ জনগণ এতে সরাসরি অংশ নেয়।
অন্যদিকে, রাষ্ট্রবিজ্ঞান হলো একটি তাত্ত্বিক, পদ্ধতিগত ও বিজ্ঞানসম্মত অ্যাকাডেমিক চর্চা বা বিষয়। এটি রাষ্ট্র, সরকার, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, ব্যবস্থা ও বিভিন্ন রাজনৈতিক তত্ত্বের নিয়মতান্ত্রিক ও বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন করে। অধ্যাপক, গবেষক এবং ছাত্ররা মূলত রাষ্ট্রবিজ্ঞান চর্চার সাথে যুক্ত থাকেন।
দ্বিতীয়ত, রাজনীতি সমাজ ও রাষ্ট্রের তাৎক্ষণিক সমস্যার সমাধান খোঁজে, যা অনেক সময় ব্যক্তিস্বার্থ বা দলীয় স্বার্থ দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞান দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা ও তত্ত্ব গঠনের কাজ করে, যা সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ।
সংক্ষেপে বলা যায়, রাজনীতি হলো বাস্তব ময়দানের খেলা, আর রাষ্ট্রবিজ্ঞান হলো সেই খেলার নিয়মকানুন, ইতিহাস ও তত্ত্বের নিয়মতান্ত্রিক অধ্যায়ন।
১০. রলসের ন্যায়বিচার তত্ত্বের ওপর একটি সংক্ষিপ্ত টীকা লিখুন।
(Write a short note on Rawls' theory of justice.)
উত্তর: বিংশ শতাব্দীর প্রখ্যাত মার্কিন দার্শনিক জন রলস তাঁর ১৯৭১ সালে প্রকাশিত "এ থিওরি অফ জাস্টিস" গ্রন্থে একটি অনন্য সামাজিক ন্যায়বিচারের তত্ত্ব প্রদান করেন। তিনি তৎকালীন উপযোগবাদের চরম বিরোধিতা করে একটি সমতাভিত্তিক, ন্যায্য ও মানবিক সমাজ গঠনের কথা বলেন। রলস তাঁর তত্ত্বে একটি কাল্পনিক আদিম পরিস্থিতির কথা বলেছেন, যাকে তিনি "অজ্ঞতার পর্দা" নাম দিয়েছেন। এই ধারণা অনুযায়ী, সমাজের নিয়মকানুন তৈরি করার সময় মানুষ নিজের সামাজিক অবস্থান, শ্রেণি, বুদ্ধি, সম্পদ বা ক্ষমতা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত থাকবে। এর ফলে মানুষ নিজেদের স্বার্থের কথা না ভেবে এমন নিয়ম তৈরি করবে যা সমাজের সবার জন্য, বিশেষ করে সবচেয়ে দুর্বল ও পিছিয়ে পড়া অংশের জন্য সুবিধাজনক হয়।
রলসের ন্যায়বিচারের প্রধান দুটি নীতি রয়েছে। প্রথমটি হলো সমান স্বাধীনতার নীতি, যা সমাজের প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য সমান মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করে। দ্বিতীয়টি হলো পার্থক্যমূলক ও সুযোগের সমতার নীতি। এই নীতি অনুযায়ী, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য সমাজে তখনই গ্রহণযোগ্য হবে, যখন তা সমাজের সবচেয়ে অনগ্রসর বা পিছিয়ে পড়া মানুষের সর্বোচ্চ উপকারে আসবে এবং রাষ্ট্রের সমস্ত পদ বা সুযোগ সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। রলসের এই তত্ত্ব আধুনিক কল্যাণকামী রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
১১. অধিকার ও কর্তব্যের পারস্পরিক সম্পর্ক ব্যাখ্যা করুন।
(Explain the mutual relationship between rights and duties.)
উত্তর: রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অধিকার ও কর্তব্যকে একটি মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ বলা হয়। এদের মধ্যে সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর, অবিচ্ছেদ্য এবং পারস্পরিক। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হ্যারল্ড ল্যাস্কির মতে, আমার অধিকার মানেই অন্যের কর্তব্য। অর্থাৎ, আমি যদি সমাজে স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার বা মত প্রকাশের অধিকার ভোগ করতে চাই, তবে অন্যের সেই একই স্বাধীনতায় বাধা না দেওয়া এবং অন্যের অধিকারকে সম্মান জানানো আমার পরম কর্তব্য।
অধিকার এবং কর্তব্য উভয়েরই জন্ম সমাজ থেকে এবং উভয়েরই মূল লক্ষ্য হলো মানুষের ব্যক্তিত্বের পূর্ণ বিকাশ ঘটানো। সমাজ বা রাষ্ট্র ছাড়া যেমন কোনো অধিকার ভোগ করা যায় না, ঠিক তেমনি নাগরিকরা যদি তাদের কর্তব্য পালন না করে, তবে সমাজ বা রাষ্ট্রের অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে পড়বে।
উদাহরণস্বরূপ, রাষ্ট্র নাগরিকদের জীবন ও সম্পত্তির নিরাপত্তা দেয় এবং বিভিন্ন মৌলিক অধিকার প্রদান করে। বিনিময়ে রাষ্ট্রের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য নাগরিকের কর্তব্য হলো নিয়মিত কর দেওয়া, রাষ্ট্রের আইন মেনে চলা এবং প্রয়োজনে দেশকে রক্ষা করা। অধিকারহীন কর্তব্য যেমন মানুষকে দাসে পরিণত করে, তেমনি কর্তব্যহীন অধিকার সমাজে চরম অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা ডেকে আনে। তাই বলা যায়, একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনে অধিকার ও কর্তব্য হাত ধরাধরি করে চলে।
১২. একজন ব্যক্তি কী কী উপায়ে নাগরিকত্ব লাভ করতে পারেন?
(In what ways can a person acquire citizenship?)
উত্তর: আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সাধারণত কয়েকটি সুনির্দিষ্ট আইনি উপায়ে নাগরিকত্ব লাভ করা যায়। এই পদ্ধতিগুলোকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়: জন্মসূত্রে এবং অনুমোদন সূত্রে।
প্রথমত, জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব লাভ। এটি আবার দুটি মূল নীতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে।
i) রক্তের সম্পর্ক নীতি এই নীতি অনুযায়ী, পিতা-মাতা যে দেশের নাগরিক, সন্তান পৃথিবীর যেখানেই জন্মগ্রহণ করুক না কেন, সে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই দেশের নাগরিকত্ব পাবে।
ii) জন্মস্থান নীতি এই নীতি অনুযায়ী, পিতা-মাতার নাগরিকত্ব যাই হোক না কেন, শিশু যে দেশের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে বা ভূখণ্ডে জন্মগ্রহণ করবে, সে সেই দেশের নাগরিকত্ব পাবে।
দ্বিতীয়ত, অনুমোদন বা দেশীয়করণ সূত্রে নাগরিকত্ব লাভ। কোনো বিদেশি নাগরিক যদি কোনো রাষ্ট্রে দীর্ঘ সময় ধরে বসবাস করে এবং সেই রাষ্ট্রের প্রচলিত কিছু শর্ত পূরণ করে আবেদন করে, তবে রাষ্ট্র তাকে নাগরিকত্ব দিতে পারে। এই শর্তগুলোর মধ্যে থাকে সে দেশের ভাষা ও সংস্কৃতির সাথে পরিচিত হওয়া, ভালো চরিত্রের অধিকারী হওয়া, সরকারি চাকরিতে নিযুক্ত হওয়া বা সে দেশের কোনো নাগরিককে বিবাহ করা। এছাড়া, ভূখণ্ড সংযুক্তি পদ্ধতির মাধ্যমেও নাগরিকত্ব পাওয়া যায়। কোনো নতুন অঞ্চল যুদ্ধ বা চুক্তির মাধ্যমে যদি কোনো রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হয়, তবে সেই অঞ্চলের অধিবাসীরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওই রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব পেয়ে যান।
১৩. মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণা (UDHR) সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত টীকা লিখুন।
(Write a short note on the Universal Declaration of Human Rights (UDHR).)
উত্তর: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংসলীলা ও অমানবিক নির্যাতনের পর বিশ্বজুড়ে মানুষের মর্যাদা ও মৌলিক অধিকার সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভূত হয়। এই উদ্দেশ্যে জাতিসংঘের উদ্যোগে ১৯৪৮ সালের ১০ই ডিসেম্বর সাধারণ সভায় 'মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণা' গৃহীত হয়। এই ঐতিহাসিক দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে প্রতি বছর ১০ই ডিসেম্বর দিনটি বিশ্বজুড়ে 'আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস' হিসেবে পালন করা হয়।
এই ঘোষণাপত্রে মোট ৩০টি অনুচ্ছেদ রয়েছে, যা জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, ভাষা বা রাজনৈতিক আদর্শ নির্বিশেষে পৃথিবীর সমস্ত মানুষের সমান, জন্মগত ও অবিচ্ছেদ্য অধিকারের কথা ঘোষণা করে। এই অনুচ্ছেদগুলোতে মানুষের জীবন, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার অধিকার, দাসত্ব ও অমানবিক নির্যাতন থেকে মুক্তি, আইনের চোখে সমতা, স্বাধীন বিচারব্যবস্থার শরণাপন্ন হওয়ার অধিকার, নিজ দেশে অবাধে চলাফেরা ও বসবাসের অধিকার, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, শিক্ষার অধিকার এবং সামাজিক নিরাপত্তার কথা বলা হয়েছে।
যদিও এই ঘোষণাটি সরাসরি কোনো দেশের ওপর আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি করে না, তবুও এর নৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম। এটি পরবর্তীকালে বিশ্বের বিভিন্ন স্বাধীন দেশের সংবিধানের মৌলিক অধিকারের অংশ এবং আন্তর্জাতিক নানা মানবাধিকার চুক্তি ও আইন গঠনের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে।
১৪. ইতিবাচক পদক্ষেপ কী এবং এটি কীভাবে সমতা রক্ষা করে?
(What is affirmative action or protective discrimination and how does it protect equality?)
উত্তর: ইতিবাচক পদক্ষেপ বা সুরক্ষামূলক বৈষম্য বলতে বোঝায়— সমাজে ঐতিহাসিকভাবে পিছিয়ে পড়া, বঞ্চিত, শোষিত বা নিপীড়িত শ্রেণির মানুষদের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনার জন্য এবং তাদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য রাষ্ট্রের গৃহীত কিছু বিশেষ ও অনুকূল সুযোগ-সুবিধা। এর একটি বড় এবং বাস্তব উদাহরণ হলো ভারতের সংবিধানে বর্ণিত তফশিলি জাতি, উপজাতি ও ওবিসিদের জন্য শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে সংরক্ষণ ব্যবস্থা।
ইতিবাচক পদক্ষেপ সমাজে প্রকৃত ও বাস্তব সমতা প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আধুনিক দৃষ্টিতে, সমানদের মধ্যে সমতা সম্ভব, কিন্তু যারা আগে থেকেই অসমান ও পিছিয়ে রয়েছে, তাদের সাথে সাধারণ মানুষের মতো সমান আচরণ করলে সমাজে বৈষম্য আরও বৃদ্ধি পায়। ইতিবাচক পদক্ষেপ সমাজের অনগ্রসর ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের প্রতিযোগিতার মূল ময়দানে সবার সাথে সমান স্তরে আসার সুযোগ করে দেয়। এটি কেবল আনুষ্ঠানিক বা খাতা-কলমের সমতা নয়, বরং ফলাফলের সমতা নিশ্চিত করতে সাহায্য করে। শিক্ষা, রাজনীতি ও কর্মসংস্থানে বিশেষ আইনি সুবিধা প্রদান করে এটি সমাজে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করে এবং একটি বৈষম্যহীন, ভারসাম্যপূর্ণ ও ন্যায়পরায়ণ সমাজ গড়ে তুলতে সাহায্য করে।
১৫. গণতন্ত্র বলতে কী বোঝ? উদারনৈতিক গণতন্ত্রের মূল নীতিগুলি আলোচনা কর।
(What is meant by democracy? Discuss the core principles of liberal democracy.)
উত্তর:
গণতন্ত্রের সংজ্ঞা ও ধারণা: গণতন্ত্র শব্দটির ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো 'ডেমোক্রেসি', যা দুটি গ্রিক শব্দ 'ডেমোস' (যার অর্থ জনগণ) এবং 'ক্রাটোস' (যার অর্থ শাসন বা ক্ষমতা) থেকে এসেছে। অতএব, শব্দার্থগতভাবে গণতন্ত্রের সরল অর্থ হলো জনগণের শাসন। মার্কিন রাষ্ট্রপতি আব্রাহাম লিংকনের মতে, "গণতন্ত্র হলো জনগণের, জনগণের দ্বারা এবং জনগণের জন্য পরিচালিত একটি শাসন ব্যবস্থা।"
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষায়, গণতন্ত্র এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা যেখানে রাষ্ট্রের চূড়ান্ত ক্ষমতা কোনো একক ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে না থেকে সমাজের সাধারণ জনগণের ওপর ন্যস্ত থাকে এবং জনগণের সম্মতিই হলো সরকারের বৈধতার মূল ভিত্তি।
উদারনৈতিক গণতন্ত্রের মূল নীতিসমূহ: আধুনিক বিশ্বে উদারনৈতিক গণতন্ত্র হলো সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক কাঠামো। এই ব্যবস্থাটি ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, পুঁজিবাদের বিকাশ এবং সীমিত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত। উদারনৈতিক গণতন্ত্রের প্রধান নীতিগুলি নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. জনগণের সার্বভৌমত্ব ও অবাধ নির্বাচন: উদারনৈতিক গণতন্ত্রের প্রধান ভিত্তি হলো জনগণের সার্বভৌমত্ব। এই ব্যবস্থায় চূড়ান্ত ক্ষমতার অধিকারী হলো জনগণ। নির্দিষ্ট সময় অন্তর প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও বহুদলীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ তাদের প্রতিনিধি বাছাই করে এবং সরকার গঠন করে।
২. সংবিধান ও আইনের শাসন: এই শাসনব্যবস্থায় কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের খেয়ালখুশিমতো দেশ পরিচালিত হয় না। রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ ভিত্তি হলো দেশের লিখিত বা অলিখিত সংবিধান এবং প্রচলিত আইন। এখানে আইনের চোখে সবাই সমান এবং ধনী-দরিদ্র, শাসক-শাসিত নির্বিশেষে সকলেই সমভাবে আইনের সুরক্ষা পাওয়ার অধিকারী।
৩. মৌলিক অধিকার ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার সুরক্ষা: উদারনৈতিক গণতন্ত্র নাগরিকের ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। সংবিধানের মাধ্যমে নাগরিকদের জীবন, সম্পত্তি, ধর্মচর্চা এবং বিশেষ করে বাক-স্বাধীনতা, মতামত প্রকাশ ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার মতো মৌলিক অধিকারগুলো সুনিশ্চিত ও সুরক্ষিত করা হয়। রাষ্ট্র চাইলেই নাগরিকদের এই স্বাভাবিক অধিকারগুলো কেড়ে নিতে পারে না।
৪. বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা: এই ব্যবস্থায় কোনো একক দলের একনায়কত্ব বা আধিপত্য থাকে না। একাধিক রাজনৈতিক দল সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে নিজেদের আদর্শ প্রচার করতে পারে এবং নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে। এর ফলে সাধারণ জনগণের সামনে বিকল্প রাজনৈতিক দল ও আদর্শ বেছে নেওয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা থাকে।
৫. স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচারবিভাগ: উদারনৈতিক গণতন্ত্রের একটি অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো আইনসভা ও শাসনবিভাগের নিয়ন্ত্রণ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত একটি স্বাধীন বিচারব্যবস্থা। এই বিচারবিভাগ নাগরিকদের মৌলিক অধিকার রক্ষা করে, সরকারের অসাংবিধানিক কাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে এবং সংবিধানের চূড়ান্ত অভিভাবক ও ব্যাখ্যাকর্তা হিসেবে কাজ করে।
৬. ক্ষমতা স্বতন্ত্রীকরণ নীতি: সরকারের তিনটি প্রধান বিভাগ— আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগের ক্ষমতাকে সম্পূর্ণ পৃথক রাখার চেষ্টা করা হয়। এর ফলে কোনো একটি বিভাগ স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে পারে না এবং সরকারের মধ্যে একটি পারস্পরিক নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্যের পরিবেশ বজায় থাকে।
৭. সংখ্যালঘু ও বিরোধী দলের অধিকারের স্বীকৃতি: উদারনৈতিক গণতন্ত্র কেবল সংখ্যাগুরুদের শাসন নয়। এখানে নির্বাচনে বিজয়ী দল সরকার গঠন করলেও, সংখ্যালঘু জনগণের অধিকার এবং বিরোধী দলের মতামতকে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে বিবেচনা করা হয়। বিরোধী দলকে 'বিকল্প সরকার' হিসেবে গণ্য করা হয় এবং তাদের গঠনমূলক সমালোচনা করার পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয়।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, উদারনৈতিক গণতন্ত্র কেবল একটি শাসন পদ্ধতি নয়, এটি একটি জীবনদর্শন। এটি একদিকে যেমন রাষ্ট্রের ক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ করে নাগরিকের ব্যক্তিস্বাধীনতাকে সর্বোচ্চ শিখরে নিয়ে যায়, অন্যদিকে তেমনি সামাজিক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।
১৬. রাজনৈতিক তত্ত্ব কী? নীতিবাচক এবং অভিজ্ঞতাবাদী রাজনৈতিক তত্ত্বের মধ্যে পার্থক্যগুলি চিহ্নিত করুন।
(What is political theory? Identify the differences between normative and empirical political theory.)
উত্তর:
রাজনৈতিক তত্ত্বের সংজ্ঞা ও প্রকৃতি:
রাজনৈতিক তত্ত্ব হলো রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এমন একটি মৌলিক ও তাত্ত্বিক শাখা যা রাষ্ট্র, সরকার, ক্ষমতা, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার, আইন এবং সমতার মতো রাজনৈতিক ধারণাগুলির উৎস, প্রকৃতি, উদ্দেশ্য এবং কার্যকারিতা নিয়ে নিয়মতান্ত্রিক ও বৌদ্ধিক আলোচনা করে।
সহজ কথায়, রাজনৈতিক জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও আদর্শকে যখন একটি সুসংবদ্ধ কাঠামোর মধ্যে আলোচনা করা হয়, তাকেই রাজনৈতিক তত্ত্ব বলা হয়। রাজনৈতিক তত্ত্বের মূল লক্ষ্য হলো রাজনৈতিক বাস্তবতাকে বোঝা এবং একটি আদর্শ সমাজ গঠনের পথ নির্দেশ করা।
নীতিবাচক বনাম অভিজ্ঞতাবাদী রাজনৈতিক তত্ত্বের পার্থক্য:
রাজনৈতিক তত্ত্বের বিবর্তনের ইতিহাসে দুটি প্রধান ধারার জন্ম হয়েছে— একটি হলো ঐতিহ্যবাহী নীতিবাচক তত্ত্ব এবং অন্যটি হলো আধুনিক অভিজ্ঞতাবাদী তত্ত্ব। এই দুটি ধারার মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গি, পদ্ধতি এবং লক্ষ্যের দিক থেকে গভীর পার্থক্য রয়েছে। নিচে এদের প্রধান পার্থক্যগুলি আলোচনা করা হলো:
১. মূল লক্ষ্য ও দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য: নীতিবাচক রাজনৈতিক তত্ত্বের মূল ফোকাস বা লক্ষ্য হলো "কী হওয়া উচিত"। এটি রাজনৈতিক জীবনের নৈতিক আদর্শ, মূল্যবোধ এবং দর্শনের ওপর জোর দেয়। এটি একটি আদর্শ রাষ্ট্র বা সমাজের রূপরেখা তৈরি করতে চায়। অন্যদিকে, অভিজ্ঞতাবাদী রাজনৈতিক তত্ত্বের মূল লক্ষ্য হলো "কী আছে" তা অনুসন্ধান করা। এটি বাস্তব রাজনৈতিক ঘটনা, মানুষের রাজনৈতিক আচরণ এবং প্রতিষ্ঠানের বস্তুনিষ্ঠ ও বাস্তবসম্মত বিবরণ দিতে পছন্দ করে।
২. পদ্ধতিগত পার্থক্য: নীতিবাচক তত্ত্বের মূল পদ্ধতি হলো দার্শনিক, কাল্পনিক, ইতিহাসভিত্তিক এবং যুক্তিপ্রধান। এই তত্ত্বের প্রবক্তারা নিজস্ব যুক্তি ও দর্শনের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্তে পৌঁছান। এর বিপরীতে, অভিজ্ঞতাবাদী তত্ত্বের পদ্ধতি হলো সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক ও আচরণবাদী। এটি পর্যবেক্ষণ, প্রত্যক্ষ তথ্য সংগ্রহ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, সমীক্ষা এবং গাণিতিক ও পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণের ওপর নির্ভর করে গড়ে ওঠে।
৩. মূল্যবোধের স্থান: নীতিবাচক রাজনৈতিক তত্ত্ব সম্পূর্ণভাবে মূল্যবোধ-সাপেক্ষ। এখানে ন্যায়, নৈতিকতা, ভালো-মন্দ এবং উচিত-অনুচিতের বিচার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই তত্ত্বের গবেষক বা দার্শনিকের নিজস্ব মানসিকতা ও আদর্শ তত্ত্বের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। অপরদিকে, অভিজ্ঞতাবাদী রাজনৈতিক তত্ত্ব হলো সম্পূর্ণ মূল্যবোধ-নিরপেক্ষ। এখানে গবেষকের নিজস্ব পছন্দ-অপছন্দ বা নৈতিক বিশ্বাসের কোনো স্থান নেই। এটি ঘটনার পেছনের কার্যকারণ সম্পর্ককে বিজ্ঞানের মতো নিরপেক্ষভাবে বিশ্লেষণ করে।
৪. প্রবক্তা ও চিন্তাবিদগণের পার্থক্য: নীতিবাচক রাজনৈতিক তত্ত্বের প্রধান প্রবক্তা হলেন প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় দার্শনিক প্লেটো, অ্যারিস্টটল, সেন্ট অগাস্টিন, রুসো, হেগেল এবং আধুনিক যুগের জন রলস। অন্যদিকে, অভিজ্ঞতাবাদী রাজনৈতিক তত্ত্বের প্রধান প্রবক্তা হলেন বিংশ শতাব্দীর আচরণবাদী রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রবার্ট ডাল, ডেভিড ইস্টন, হ্যারল্ড লাসওয়েল প্রমুখ।
৫. উদাহরণের ক্ষেত্রে পার্থক্য: নীতিবাচক তত্ত্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উদাহরণ হলো প্লেটোর 'আদর্শ রাষ্ট্র' বা টমাস মোরের 'ইউটোপিয়া' এবং রলসের 'ন্যায়বিচার তত্ত্ব', যা বাস্তবে কোথাও অস্তিত্বশীল না হলেও একটি পরম লক্ষ্য নির্দেশ করে। অন্যদিকে, অভিজ্ঞতাবাদী তত্ত্বের উদাহরণ হলো কোনো দেশের নির্বাচনী আচরণ বা ভোটিং প্যাটার্নের ওপর সমীক্ষা, ক্ষমতার উৎস নিয়ে মাঠপর্যায়ের গবেষণা ইত্যাদি।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, নীতিবাচক তত্ত্ব যদি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আত্মা বা নৈতিক ভিত্তি হয়, তবে অভিজ্ঞতাবাদী তত্ত্ব হলো তার দেহ বা বিজ্ঞানসম্মত বাস্তব রূপ। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এই দুটি তত্ত্বই সমান গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আদর্শ ছাড়া বাস্তব যেমন লক্ষ্যহীন, তেমনি বাস্তব ভিত্তি ছাড়া আদর্শও সম্পূর্ণ কাল্পনিক।
১৭. স্বাধীনতার সংজ্ঞা দিন। ইতিবাচক ও নেতিবাচক স্বাধীনতার ধারণা দুটি আলোচনা করুন।
(Define liberty. Discuss the concepts of positive and negative liberty.)
উত্তর: স্বাধীনতার সংজ্ঞা: রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অন্যতম মৌলিক ও বিতর্কিত ধারণা হলো স্বাধীনতা। ইংরেজি 'লিবার্টি' শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে ল্যাটিন শব্দ 'লিবার' থেকে, যার অর্থ হলো স্বাধীন বা মুক্ত। সাধারণ অর্থে স্বাধীনতা বলতে যেকোনো ধরনের বন্ধন বা নিয়মের অনুপস্থিতিকে বোঝায়, অর্থাৎ নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী যেকোনো কাজ করাকে স্বাধীনতা বলে। কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এই অর্থ গ্রহণযোগ্য নয়, কারণ অবাধ স্বাধীনতা সমাজে অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা তৈরি করে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিভাষায়, স্বাধীনতা বলতে বোঝায় এমন এক সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ, যেখানে কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব বিকাশের পথে কোনো অযৌক্তিক বাধা থাকবে না এবং প্রত্যেকে নিজের অধিকার সুনিশ্চিতভাবে ভোগ করতে পারবে।
স্বাধীনতার দুটি রূপ: বিখ্যাত রাজনৈতিক দার্শনিক আইসাইয়া বার্লিন তাঁর ১৯৫৮ সালে প্রকাশিত "টু কনসেপ্টস অফ লিবার্টি" নামক প্রবন্ধে স্বাধীনতার দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ও জনপ্রিয় ধারণার কথা আলোচনা করেছেন। এগুলো হলো— নেতিবাচক স্বাধীনতা এবং ইতিবাচক স্বাধীনতা। নিচে এই দুটি ধারণা বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. নেতিবাচক স্বাধীনতা: নেতিবাচক স্বাধীনতার মূল কথা হলো "হস্তক্ষেপ না করা" বা বাধার অনুপস্থিতি। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, একজন ব্যক্তি তার নিজের ব্যক্তিগত সীমানার মধ্যে যা খুশি তাই করতে পারে এবং রাষ্ট্র, সমাজ বা অন্য কোনো ব্যক্তি তার সেই কাজে কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ বা জোরজুলুম করবে না। এখানে মানুষের স্বাধীনতার পরিধি ততটাই বিস্তৃত হবে, যতটা ক্ষেত্র রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত থাকবে।এই তত্ত্বের সমর্থকরা মনে করেন, রাষ্ট্র হলো একটি "প্রয়োজনীয় শয়তান" এবং রাষ্ট্রের কাজ কেবল নাগরিকদের নিরাপত্তা দেওয়া। তাই রাষ্ট্রকে এখানে একটি 'নৈশ প্রহরী রাষ্ট্র' হিসেবে দেখা হয়। রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ যত কম হবে, মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতা তত বৃদ্ধি পাবে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এই নীতি অবাধ বাণিজ্য বা লেসেজ ফেয়ার নীতিকে সমর্থন করে। এই মতবাদের প্রধান প্রবক্তা ও সমর্থক হলেন জন লক, অ্যাডাম স্মিথ, জে এস মিল, এফ এ হায়েক এবং আইসাইয়া বার্লিন নিজে।
২. ইতিবাচক স্বাধীনতা: ইতিবাচক স্বাধীনতার ধারণাটি কেবল বাধার অনুপস্থিতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি ব্যক্তিত্ব বিকাশের জন্য অনুকূল সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুযোগের উপস্থিতির ওপর জোর দেয়। এই তত্ত্বের সমর্থকরা যুক্তি দেন যে, একজন চরম দরিদ্র, ক্ষুধার্ত বা নিরক্ষর মানুষকে যদি রাষ্ট্র কোনো কাজে বাধা নাও দেয়, তবুও সে তার স্বাধীনতা প্রকৃত অর্থে ভোগ করতে পারে না। কারণ তার কাছে সেই স্বাধীনতা ব্যবহার করার মতো ক্ষমতা বা সুযোগ নেই।তাই ইতিবাচক স্বাধীনতা অনুযায়ী, রাষ্ট্র কেবল নীরব দর্শক হয়ে বসে থাকবে না, বরং রাষ্ট্র একটি কল্যাণকামী ভূমিকা পালন করবে। রাষ্ট্র আইন করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক নিরাপত্তার সুযোগ তৈরি করবে, যাতে সমাজের দরিদ্র, অনগ্রসর ও শোষিত শ্রেণির মানুষরা নিজেদের ক্ষমতায়ন ঘটাতে পারে এবং স্বাধীনতার প্রকৃত আনন্দ উপভোগ করতে পারে। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, রাষ্ট্র নাগরিকের স্বাধীনতার শত্রু নয়, বরং বন্ধু ও সহায়ক। এই মতবাদের প্রধান প্রবক্তা ও সমর্থক হলেন টি এইচ গ্রিন, হ্যারল্ড ল্যাস্কি, আর্নেস্ট বার্কার এবং কার্ল মার্ক্স।উপসংহার: সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, নেতিবাচক স্বাধীনতা যেখানে ব্যক্তির একক ও নিরঙ্কুশ স্বাধীনতার ক্ষেত্রকে সুরক্ষিত করতে চায়, সেখানে ইতিবাচক স্বাধীনতা সামাজিক ন্যায়বিচার ও সামগ্রিক কল্যাণের মাধ্যমে স্বাধীনতার বাস্তব রূপায়ণ ঘটাতে চায়। একটি সুস্থ ও আদর্শ গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনে এই দুটি ধারণারই পারস্পরিক ভারসাম্য থাকা অত্যন্ত প্রয়োজন।
১৮. সুশীল সমাজ কীভাবে রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ বা ভূমিকা পালন করে?
(How does civil society intervene or play a role in the state?)
উত্তর: সুশীল সমাজের সংজ্ঞা ও ধারণা: আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজতত্ত্বে 'সুশীল সমাজ' বা দেওয়ানি সমাজ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং গতিশীল ধারণা। সহজ কথায়, সুশীল সমাজ বলতে রাষ্ট্র এবং পরিবারের বাইরে গড়ে ওঠা নাগরিক সমাজের এমন কিছু অরাজনৈতিক, অলাভজনক, স্বশাসিত এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বা মঞ্চকে বোঝায়, যা সম্পূর্ণ জনস্বার্থে এবং সামাজিক কল্যাণে কাজ করে। এর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা বা এনজিও, ক্লাব, পেশাজীবী সংগঠন (যেমন শিক্ষক বা চিকিৎসকদের সমিতি), ট্রেড ইউনিয়ন, মানবাধিকার গোষ্ঠী, পরিবেশবাদী আন্দোলন এবং সংবাদমাধ্যম। সুশীল সমাজ সরাসরি রাজনৈতিক ক্ষমতায় অংশগ্রহণের চেষ্টা করে না, কিন্তু রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে সুশীল সমাজের ভূমিকা ও হস্তক্ষেপ: একটি সুস্থ ও সচল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের স্বৈরাচারী প্রবণতা রোধ করতে এবং জনগণের অধিকার রক্ষা করতে সুশীল সমাজ বহুমুখী ভূমিকা ও হস্তক্ষেপ পালন করে। নিচে এই বিষয়গুলি বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. রাষ্ট্রের স্বৈরাচারী ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ: রাষ্ট্র যখন অন্যায্য আইন প্রণয়ন করে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার কেড়ে নিতে চায় বা স্বৈরাচারী হয়ে ওঠে, তখন সুশীল সমাজ প্রতিরোধ গড়ে তোলে। তারা বিভিন্ন শান্তিপূর্ণ আন্দোলন, পদযাত্রা, বিক্ষোভ এবং জনস্বার্থ মামলার মাধ্যমে রাষ্ট্রের ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করে এবং সরকারকে পিছু হটতে বাধ্য করে। উদাহরণস্বরূপ, ভারতের 'আন্না হাজারের দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলন' বা বিভিন্ন সময়ের কৃষক আন্দোলন সরকারের নীতিকে পরিবর্তন করতে বাধ্য করেছিল।
২. জনমত গঠন ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি: সুশীল সমাজ বিভিন্ন জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সমস্যা, যেমন— পরিবেশ দূষণ, লিঙ্গ বৈষম্য, মানবাধিকার লঙ্ঘন, দুর্নীতি এবং শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক সচেতনতা তৈরি করে। সেমিনার, পথনাটক, লিফলেট বিতরণ এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সাহায্যে তারা একটি শক্তিশালী জনমত গঠন করে, যা সরকারকে নতুন কল্যাণকামী আইন তৈরি করতে বাধ্য করে।
৩. নীতিনির্ধারণে পরামর্শ ও বিকল্প খসড়া তৈরি: অনেক সময় সুশীল সমাজের অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন বুদ্ধিজীবী, গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা দেশের গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিষয়ে গভীর গবেষণা চালান। তারা সরকারের খসড়া নীতির ওপর গঠনমূলক সমালোচনা করেন এবং বিকল্প জনমুখী নীতির প্রস্তাব জমা দেন। ভারতের ঐতিহাসিক 'তথ্য জানার অধিকার আইন' বা আরটিআই এবং 'মহাত্মা গান্ধী জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান গ্যারান্টি আইন' বা মনরেগা প্রণয়নের পেছনে সুশীল সমাজের সংগঠনগুলির অবদান ছিল অনস্বীকার্য।
৪. সরকারি পরিষেবার পরিপূরক হিসেবে কাজ: অনেক সময় রাষ্ট্রের সম্পদ বা প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতার কারণে প্রত্যন্ত ও অনুন্নত অঞ্চলে সরকারি পরিষেবা সঠিকভাবে পৌঁছায় না। সেই সমস্ত পিছিয়ে পড়া এলাকায় বিভিন্ন বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা বা এনজিও শিক্ষা, প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিষেবা, পানীয় জলের ব্যবস্থা, নারী সচেতনতা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় ত্রাণকার্য পৌঁছে দিয়ে রাষ্ট্রের পরিপূরক ও সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে।
৫. স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ: সুশীল সমাজ সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজের ওপর কড়া নজরদারি চালায়। তারা সামাজিক অডিট বা সামাজিক নিরীক্ষার মাধ্যমে সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার হচ্ছে কিনা তা খতিয়ে দেখে। এর ফলে শাসনব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আসে এবং আমলা ও রাজনীতিকদের দুর্নীতি হ্রাস পায়, যা সামগ্রিকভাবে গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী ও মজবুত করে তোলে।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, সুশীল সমাজ হলো রাষ্ট্র ও সাধারণ জনগণের মধ্যকার একটি মজবুত সেতু। এটি একদিকে যেমন রাষ্ট্রের স্বৈরাচারী মনোভাবের বিরুদ্ধে জনগণের রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে, অন্যদিকে তেমনি রাষ্ট্রের শাসনতান্ত্রিক কাঠামোকে আরও বেশি গণতান্ত্রিক, জনমুখী ও জবাবদিহিমূলক করতে সাহায্য করে।
১৯. লিঙ্গ বলতে কী বোঝেন? সুরক্ষামূলক বৈষম্যের নীতি কীভাবে নারীদের বাধা দূর করে তাদের ক্ষমতায়ন করেছে?
(What do you understand by gender? How has the policy of protective discrimination removed barriers for women and empowered them?)
উত্তর:
লিঙ্গ বা জেন্ডারের ধারণা: আধুনিক সমাজবিজ্ঞান ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মানুষের লিঙ্গগত পরিচয় আলোচনার ক্ষেত্রে 'সেক্স' এবং 'জেন্ডার'-এর মধ্যে একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য করা হয়। প্রথমত, সেক্স বা জৈবিক লিঙ্গভেদ হলো সম্পূর্ণ একটি প্রাকৃতিক, জন্মগত ও জৈবিক বিষয়। এটি পুরুষ ও নারী শরীরের প্রাকৃতিক ও অঙ্গসংস্থানগত গঠনকে নির্দেশ করে, যা চিরন্তন ও অপরিবর্তনীয়। দ্বিতীয়ত, জেন্ডার বা সামাজিক লিঙ্গ হলো কোনো প্রাকৃতিক বিষয় নয়, বরং এটি সমাজ কর্তৃক কৃত্রিমভাবে তৈরি একটি ধারণা। একটি নির্দিষ্ট সমাজ ও সংস্কৃতি পুরুষ ও নারীর জন্য যে আলাদা ভূমিকা, আচরণ, দায়িত্ব, পোশাক, অধিকার ও মর্যাদা নির্ধারণ করে দেয়, তাকেই জেন্ডার বলা হয়। এটি পরিবর্তনশীল এবং স্থান-কাল-পাত্র ভেদে আলাদা হতে পারে। যেমন— "মেয়েরা কেবল ঘরের কাজ ও সন্তান লালন-পালন করবে এবং ছেলেরা বাইরের অর্থনৈতিক কাজ করবে"— এই ধারণাটি কোনো প্রাকৃতিক নিয়ম নয়, এটি সমাজ ও পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার তৈরি করা জেন্ডার বৈষম্যের একটি প্রকট উদাহরণ।
সুরক্ষামূলক বৈষম্য ও নারী ক্ষমতায়ন: ইতিহাসের সূচনা থেকেই নারীরা সমাজে শোষিত, বঞ্চিত, অবদমিত এবং পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর দ্বারা নানা বাধার সম্মুখীন হয়েছে। এই দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক ও সামাজিক বৈষম্য দূর করে নারীদের সমাজের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনার জন্য আধুনিক কল্যাণকামী রাষ্ট্রগুলি 'সুরক্ষামূলক বৈষম্য' বা ইতিবাচক পদক্ষেপের নীতি গ্রহণ করেছে। এই নীতি অনুযায়ী, সমাজে প্রকৃত সমতা আনার জন্য পিছিয়ে পড়া নারীদের রাষ্ট্র কিছু বিশেষ ও অনুকূল সুযোগ-সুবিধা প্রদান করে।
এই নীতি যেভাবে নারীদের সামাজিক বাধা দূর করে তাদের প্রকৃত ক্ষমতায়ন ঘটিয়েছে, তা নিচে আলোচনা করা হলো:
১. শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে সংরক্ষণ নীতি: বিভিন্ন সরকারি চাকরি, পেশাদার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে নারীদের জন্য আসন সংরক্ষিত রাখার ফলে আর্থিক ও সামাজিকভাবে তাদের স্বনির্ভরতা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর এই ক্ষমতা তাদের পরিবারের ভেতরে ও বাইরে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সমানাধিকার এনে দিয়েছে।
২. রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন ও নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা: ভারতীয় সংবিধানের ৭৩ ও ৭৪তম সংশোধনীর মাধ্যমে গ্রামীণ পঞ্চায়েত এবং শহুরে পুরসভা ও পৌরনিগমের স্থানীয় শাসন ব্যবস্থায় নারীদের জন্য ৩৩ শতাংশ (বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ সহ বহু রাজ্যে এটি ৫০ শতাংশ) আসন সংরক্ষণ করা হয়েছে। এর ফলে লক্ষ লক্ষ সাধারণ ও অনগ্রসর পরিবারের নারী আজ রাজনৈতিক নেতৃত্বে এগিয়ে এসেছেন এবং গ্রামীণ ও স্থানীয় নীতিনির্ধারণে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন।
৩. বিশেষ আইনি সুরক্ষা ও কল্যাণমূলক আইন: কর্মক্ষেত্রে নারীদের কাজের পরিবেশকে নিরাপদ ও মসৃণ করার জন্য রাষ্ট্র বহু আইন প্রণয়ন করেছে। যেমন— মাতৃত্বকালীন ছুটি বা মেটারনিটি লিভ, সমান কাজের জন্য সমান মজুরি আইন এবং কর্মক্ষেত্রে নারীদের যৌন হেনস্থা প্রতিরোধ আইন। এই আইনগুলো পুরুষতান্ত্রিক সমাজের তৈরি করা সামাজিক ও মানসিক ভীতি দূর করে নারীদের ঘরের বাইরে কাজ করার আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে।
৪. অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাধা দূরীকরণ: কন্যাশ্রী, রূপশ্রীর মতো বিভিন্ন সরকারি রূপান্তরমূলক প্রকল্প এবং স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মাধ্যমে নারীদের সরাসরি ব্যাংকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ফলে সমাজ থেকে বাল্যবিবাহের হার যেমন হ্রাস পেয়েছে, তেমনি অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন হওয়ার কারণে পরিবার ও সমাজে নারীদের প্রতি মর্যাদাপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়েছে।
উপসংহার: সংক্ষেপে বলা যায়, সুরক্ষামূলক বৈষম্যের নীতি নারীদের প্রতি রাষ্ট্রের কোনো দয়া বা অনুকম্পা নয়। এটি শতাব্দী প্রাচীন পুরুষতান্ত্রিক সমাজের তৈরি করা জেন্ডার বৈষম্য ও কৃত্রিম বাধাগুলোকে ভেঙে চুরমার করে পুরুষ ও নারীর মধ্যে একটি প্রকৃত, বাস্তব ও দীর্ঘস্থায়ী সমতা আনার অত্যন্ত শক্তিশালী এবং সফল একটি আইনি হাতিয়ার।
ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য কিছু প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQs)
