বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয় ১ম সেমিস্টার রাষ্ট্রবিজ্ঞান প্রশ্ন ও উত্তর | VU Pol Science MJ A1 PYQ

Vidyasagar University (VU) UG 1st Semester Political Science Previous Years' Questions & Answers (Major MJ A1)

বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন শিক্ষানীতি (CCFUP - NEP 2020) অনুযায়ী স্নাতক প্রথম সেমিস্টারের রাষ্ট্রবিজ্ঞান (Political Science) জেনারেল মেজর (VU MJ A1 General Major 1st Sem) পরীক্ষার্থীদের জন্য এই পেজটি তৈরি করা হয়েছে। এখানে তোমরা 2023, 2024, এবং 2025 সালের বিগত বছরের সমস্ত পরীক্ষার প্রশ্নপত্র (PYQs) এবং তার সম্পূর্ণ নির্ভুল সমাধান ও নোটস পেয়ে যাবে । পরীক্ষা প্রস্তুতিকে আরও মজবুত করতে এবং ভালো নম্বর পেতে এই প্রশ্ন-উত্তরগুলো নিয়মিত অনুশীলন করতে হবে ।

 VU MJ A1 General Major 1st Sem Exam (NEP-CCFUP) 2024 সালের প্রশ্ন ও উত্তর দেখতে এখানে ক্লিক কর

বিভাগ ক * Group A * প্রতিটি প্রশ্নের মান ২

১। রাজনীতি তত্ত্ব বলতে কি বোঝ? (What do you mean by Political Theory?)

উত্তর: রাজনীতি তত্ত্ব বলতে রাষ্ট্র, সরকার, আইন, স্বাধীনতা, সাম্য এবং ন্যায়বিচারের মতো রাজনৈতিক ধারণাগুলির বিজ্ঞানসম্মত ও দর্শনভিত্তিক আলোচনাকে বোঝায়। এটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রকৃতি ও উদ্দেশ্য বিশ্লেষণ করে এবং আদর্শ সমাজ গঠনের রূপরেখা দেয়।

২। রাজনৈতিক তত্ত্বের দু'টি বৈশিষ্ট্য লেখ। (Write two characteristics of Political Theory.)

উত্তর: প্রথমত, রাজনৈতিক তত্ত্ব বাস্তব রাজনৈতিক ঘটনাগুলোর সাথে আদর্শ এবং নৈতিকতার সমন্বয় সাধন করে। দ্বিতীয়ত, এটি একটি গতিশীল প্রক্রিয়া যা সময়ের সাথে সাথে সমাজ ও মানুষের পরিবর্তিত চাহিদার ভিত্তিতে ক্রমাগত পরিবর্তিত ও পরিমার্জিত হয়।

৩। গণতন্ত্রের সংজ্ঞা দাও। (Define Democracy.)

উত্তর: গণতন্ত্র হলো এমন এক শাসনব্যবস্থা যেখানে রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতা মুষ্টিমেয় কোনো ব্যক্তির হাতে না থেকে সামগ্রিকভাবে জনগণের হাতে ন্যস্ত থাকে। আব্রাহাম লিংকনের মতে, গণতন্ত্র হলো জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য এবং জনগণের শাসন।

৪। পরোক্ষ গণতন্ত্র কাকে বলে? (What is indirect democracy?)

উত্তর: যে শাসনব্যবস্থায় নাগরিকরা সরাসরি শাসনকার্যে অংশগ্রহণ না করে, বরং নির্দিষ্ট সময় অন্তর তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনা করে, তাকে পরোক্ষ গণতন্ত্র বা প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র বলে। আধুনিক বৃহৎ রাষ্ট্রগুলোতে এই ব্যবস্থাই প্রচলিত।

৫। প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের যে কোন দু'টি উদাহরণ লেখ। (Write any two examples of direct democracy.)

উত্তর: প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের দুটি উদাহরণ হলো প্রাচীন গ্রিসের নগররাষ্ট্রগুলোর (যেমন এথেন্স) শাসনব্যবস্থা এবং বর্তমান সুইজারল্যান্ডের কয়েকটি ক্যান্টনে প্রচলিত গণভোট বা ইনিশিয়েটিভ ব্যবস্থা যেখানে নাগরিকরা সরাসরি আইন প্রণয়নে অংশ নেয়।

৬। লিঙ্গের সংজ্ঞা দাও। (Define Gender.)

উত্তর: সমাজবিজ্ঞানের পরিভাষায় লিঙ্গ বা জেন্ডার বলতে নারী ও পুরুষের মধ্যে সামাজিকভাবে নির্মিত পার্থক্যকে বোঝায়। এটি কেবল নারী ও পুরুষের জৈবিক পার্থক্য নয়, বরং সমাজ কর্তৃক নির্ধারিত নারী ও পুরুষের নির্দিষ্ট ভূমিকা, আচরণ, কাজ ও দায়িত্বকে নির্দেশ করে।

৭। নাগরিক সমাজ ও রাষ্ট্রের যে কোন দু'টি পার্থক্য লেখ।
(Write any two differences between Civil Society and the State.)

উত্তর: প্রথমত, রাষ্ট্র একটি চূড়ান্ত রাজনৈতিক ও জবরদস্তিমূলক প্রতিষ্ঠান, কিন্তু নাগরিক সমাজ হলো বিভিন্ন সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত সম্পূর্ণ স্বেচ্ছামূলক ও অরাজনৈতিক ক্ষেত্র। দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রের সদস্যপদ সকলের জন্য বাধ্যতামূলক, কিন্তু নাগরিক সমাজের অন্তর্ভুক্ত সংগঠনগুলোর সদস্যপদ ব্যক্তির ইচ্ছাধীন বা ঐচ্ছিক।

৮। সাম্য বলতে কি বোঝায়? (What is meant by Equality?)

উত্তর: সাম্য বলতে সমাজে ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, জাতি বা জন্মস্থান নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষের জন্য সমান সুযোগ-সুবিধা এবং আত্মবিকাশের সমান অধিকার নিশ্চিত করাকে বোঝায়। এর প্রকৃত অর্থ হলো সমাজে কোনো বিশেষ সুবিধাভোগী শ্রেণীর অনুপস্থিতি থাকা।

বিভাগ খ * Group B * প্রতিটি প্রশ্নের মান ৫

৯। রাজনৈতিক তত্ত্বের প্রাসঙ্গিকতা কী?
(What is the relevance of political theory?)

উত্তর: রাজনৈতিক তত্ত্ব রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একটি মৌলিক ও অপরিহার্য অংশ। বর্তমান যুগে রাজনৈতিক তত্ত্বের প্রাসঙ্গিকতা বা গুরুত্ব অপরিসীম। নিচে এর প্রাসঙ্গিকতার মূল দিকগুলো বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।
প্রথমত, রাজনৈতিক তত্ত্ব আমাদের রাজনৈতিক ধারণাগুলোকে স্পষ্টভাবে বুঝতে সাহায্য করে। স্বাধীনতা, সাম্য, ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতার মতো শব্দগুলো আমরা প্রতিনিয়ত ব্যবহার করি। কিন্তু এগুলোর প্রকৃত অর্থ ও তাৎপর্য কী, তা রাজনৈতিক তত্ত্ব অধ্যয়নের মাধ্যমেই জানা যায়। এটি আমাদের রাজনৈতিক জ্ঞানকে সুশৃঙ্খল ও যুক্তিনির্ভর করে তোলে।
দ্বিতীয়ত, এটি বাস্তব রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানের পথ দেখায়। সমাজে বিদ্যমান নানা বৈষম্য, সংঘাত এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার মূল কারণগুলো অনুসন্ধান করে রাজনৈতিক তত্ত্ব তার সমাধানের একটি আদর্শ রূপরেখা প্রদান করে। এটি কেবল সমস্যার বর্ণনা দেয় না, বরং একটি উন্নততর সমাজ গঠনের জন্য নীতি নির্ধারণে সাহায্য করে।
তৃতীয়ত, রাজনৈতিক তত্ত্ব নাগরিকদের অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। রাষ্ট্রের প্রতি একজন নাগরিকের কী দায়িত্ব এবং রাষ্ট্র কীভাবে নাগরিকের অধিকার রক্ষা করবে, সেই সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা প্রদান করে রাজনৈতিক তত্ত্ব। এর ফলে নাগরিকরা রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সক্রিয় ও সচেতনভাবে অংশগ্রহণ করতে পারে, যা যেকোনো সফল গণতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
চতুর্থত, বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে রাজনৈতিক তত্ত্বের পরিধি আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিবেশগত সমস্যা, মানবাধিকার, বিশ্বায়ন, নারীবাদ ইত্যাদি নতুন নতুন বিষয়গুলো রাজনৈতিক তত্ত্বের আলোচ্য সূচিতে যুক্ত হয়েছে। এই সমস্ত আন্তর্জাতিক ও সমসাময়িক সমস্যাগুলোর তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এবং তার সমাধানের পথ খুঁজতে রাজনৈতিক তত্ত্ব আমাদের ভীষণভাবে সাহায্য করে।
পরিশেষে বলা যায়, রাজনৈতিক তত্ত্ব কেবল তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, এটি আমাদের বাস্তব জীবনের সাথে গভীরভাবে যুক্ত। সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ গঠন, সমাজের উন্নতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি আদর্শ রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক তত্ত্বের চর্চা ও প্রয়োগ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও অপরিহার্য।

১০। গণতন্ত্রের প্রকারভেদ আলোচনা কর। (Discuss the types of democracy.)

উত্তর: গণতন্ত্র হলো এমন একটি শাসনব্যবস্থা যেখানে চূড়ান্ত শাসনক্ষমতা জনগণের হাতে ন্যস্ত থাকে। প্রয়োগ ও কাঠামোর ভিত্তিতে গণতন্ত্রকে প্রধানত কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়। নিচে গণতন্ত্রের প্রধান প্রকারভেদগুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
প্রথমত, প্রত্যক্ষ বা বিশুদ্ধ গণতন্ত্র। এটি হলো গণতন্ত্রের প্রাচীনতম রূপ। যে শাসনব্যবস্থায় নাগরিকরা রাষ্ট্রের আইন প্রণয়ন, নীতি নির্ধারণ এবং শাসনকার্য পরিচালনায় সরাসরি অংশগ্রহণ করে, তাকে প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র বলে। প্রাচীন গ্রিসের ছোট ছোট নগররাষ্ট্রগুলোতে এই ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। বর্তমানে রাষ্ট্রের আয়তন ও জনসংখ্যা বিশাল হওয়ায় এই ব্যবস্থার প্রয়োগ প্রায় অসম্ভব। তবে সুইজারল্যান্ডের কয়েকটি ক্যান্টনে এখনো গণভোট এবং উদ্যোগের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের কিছু প্রয়োগ দেখা যায়।
দ্বিতীয়ত, পরোক্ষ বা প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র। বর্তমান যুগে বিশ্বের প্রায় সকল গণতান্ত্রিক দেশেই এই ব্যবস্থা প্রচলিত। এই ব্যবস্থায় নাগরিকরা সরাসরি শাসনকার্যে অংশ নেয় না। তারা নির্দিষ্ট সময় অন্তর নির্বাচনের মাধ্যমে নিজেদের প্রতিনিধি নির্বাচন করে। এই নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই আইনসভায় বসে জনগণের হয়ে রাষ্ট্রের শাসনকার্য পরিচালনা করে। ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ইত্যাদি দেশে পরোক্ষ গণতন্ত্র বিদ্যমান।

পরোক্ষ গণতন্ত্রকে আবার দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়।

ক. সংসদীয় বা ক্যাবিনেট শাসিত গণতন্ত্র: এই ব্যবস্থায় শাসনবিভাগ তার কাজের জন্য সরাসরি আইনসভার কাছে দায়ী থাকে। এখানে নামসর্বস্ব এবং প্রকৃত, এই দুই ধরনের শাসক থাকেন। ভারতের শাসনব্যবস্থা হলো সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
খ. রাষ্ট্রপতি শাসিত গণতন্ত্র: এই ব্যবস্থায় শাসনবিভাগ ও আইনবিভাগ সম্পূর্ণ আলাদা থাকে। রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের প্রকৃত প্রধান হন এবং তিনি তার কাজের জন্য আইনসভার কাছে দায়ী থাকেন না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা হলো এর একটি অন্যতম উদাহরণ। এছাড়া আধুনিক যুগে অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র নামে আরও একটি রূপ দেখা যায়, যেখানে কেবল ভোট দেওয়াই নয়, বরং স্থানীয় প্রশাসন ও সমাজের বিভিন্ন স্তরে সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণের ওপর জোর দেওয়া হয়। পাশাপাশি বহুত্ববাদী গণতন্ত্র সমাজের বিভিন্ন স্বার্থগোষ্ঠীর মধ্যে সমন্বয় সাধন করে।

উপসংহারে বলা যায়, রূপ বা কাঠামো যেমনই হোক না কেন, গণতন্ত্রের মূল উদ্দেশ্য হলো জনগণের অধিকার রক্ষা করা এবং তাদের কল্যাণে কাজ করা। আধুনিক বৃহৎ ও জটিল রাষ্ট্রব্যবস্থায় পরোক্ষ গণতন্ত্রই সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য ও বাস্তবসম্মত রূপ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

১১। নাগরিকদের অধিকার ও কর্তব্যের মধ্যে সম্পর্ক আলোচনা কর।
(Describe the concept of protective discrimination or affirmative action.)

উত্তর: নাগরিকদের অধিকার ও কর্তব্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও পরিপূরক ধারণা। সমাজ ও রাষ্ট্রের সদস্য হিসেবে একজন ব্যক্তি নিজের ব্যক্তিত্ব বিকাশের জন্য যে সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে, তাকে অধিকার বলা হয়। অন্যদিকে, রাষ্ট্রের প্রতি বা সমাজের প্রতি নাগরিকের যে দায়িত্ব থাকে, তাকে বলা হয় কর্তব্য। এই অধিকার ও কর্তব্যের মধ্যে একটি অত্যন্ত নিবিড় ও অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক রয়েছে। নিচে এই সম্পর্ক বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

প্রথমত, অধিকার ও কর্তব্য মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠের মতো। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটির অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ল্যাস্কির মতে, আমার অধিকার অন্যের কর্তব্যের মধ্যে নিহিত রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, যদি আমার রাস্তা দিয়ে স্বাধীনভাবে চলার অধিকার থাকে, তবে আমার কর্তব্য হলো অন্যকে সেই রাস্তা দিয়ে স্বাধীনভাবে চলতে দেওয়া। অর্থাৎ, আমি তখনই অধিকার ভোগ করতে পারব, যখন অন্যরা তাদের কর্তব্য পালন করবে।

দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্র অধিকার প্রদান করে এবং বিনিময়ে কর্তব্য দাবি করে। রাষ্ট্র নাগরিককে আইনগত, রাজনৈতিক এবং সামাজিক অধিকার দেয় যাতে নাগরিকের ব্যক্তিত্বের পূর্ণ বিকাশ ঘটে। এর বিনিময়ে রাষ্ট্র আশা করে যে নাগরিক রাষ্ট্রের আইন মেনে চলবে, নিয়মিত কর প্রদান করবে এবং রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত থাকবে। নাগরিকরা কর্তব্য পালন না করলে রাষ্ট্রের পক্ষে অধিকার রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।

তৃতীয়ত, অধিকারের সদ্ব্যবহারই হলো একটি বড় কর্তব্য। রাষ্ট্র আমাকে যে বাকস্বাধীনতা বা মতপ্রকাশের অধিকার দিয়েছে, সেই অধিকারটি এমনভাবে ব্যবহার করা উচিত যাতে অন্যের সম্মান বা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ক্ষুণ্ণ না হয়। সমাজকল্যাণের উদ্দেশ্যে নিজের অধিকারকে নিয়ন্ত্রিত ও যুক্তিসঙ্গতভাবে ব্যবহার করাই হলো একজন সচেতন নাগরিকের প্রধান কর্তব্য।

চতুর্থত, অধিকার ও কর্তব্য উভয়ই সমাজকল্যাণের সাথে যুক্ত। আমরা কেবল সেই অধিকারগুলোই ভোগ করি যা সমাজের কল্যাণে সহায়ক। আবার আমাদের কর্তব্যগুলোও সমাজকে একটি সুন্দর ও সুশৃঙ্খল রূপে গড়ে তুলতে সাহায্য করে। তাই বলা যায়, অধিকার ও কর্তব্য উভয়েরই চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো সমাজ ও রাষ্ট্রের সার্বিক উন্নতি সাধন।
উপসংহারে বলা যায়, অধিকার ও কর্তব্যের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই, বরং তারা একে অপরের পরিপূরক। কর্তব্যহীন অধিকার যেমন সমাজে স্বৈরাচারিতার জন্ম দেয়, তেমনি অধিকারহীন কর্তব্য মানুষকে দাসে পরিণত করে। একটি সুস্থ ও উন্নত গণতান্ত্রিক সমাজ গড়ে তোলার জন্য নাগরিকদের অধিকার ভোগ করার পাশাপাশি নিজেদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সমানভাবে সচেতন হওয়া একান্ত প্রয়োজন।

১২। প্রতিরক্ষামূলক বৈষম্য বা ইতিবাচক পদক্ষেপের ধারণা বর্ণনা কর।
(Describe the concept of protective discrimination or affirmative action.)

উত্তর: প্রতিরক্ষামূলক বৈষম্য বা ইতিবাচক পদক্ষেপ হলো আধুনিক কল্যাণকামী রাষ্ট্রের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নীতি। সাধারণ অর্থে সমতা বলতে বোঝায় আইনের চোখে সবাই সমান এবং কেউ কোনো বিশেষ সুযোগ-সুবিধা পাবে না। কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে সমাজের একটি বিশাল অংশ দীর্ঘদিন ধরে জাতি, ধর্ম, বর্ণ বা লিঙ্গের কারণে বৈষম্য ও শোষণের শিকার হয়েছে। এই পিছিয়ে পড়া এবং অবহেলিত গোষ্ঠীকে সমাজের মূল স্রোতে তুলে আনার জন্য রাষ্ট্র যে বিশেষ সুযোগ-সুবিধা বা সংরক্ষণমূলক নীতি গ্রহণ করে, তাকেই প্রতিরক্ষামূলক বৈষম্য বা ইতিবাচক পদক্ষেপ বলা হয়।এই ধারণার মূল উদ্দেশ্য হলো প্রকৃত বা বাস্তব সমতা প্রতিষ্ঠা করা। কেবল সংবিধানে সমতার কথা লিখে রাখলে বা সবাইকে সমান আইনগত অধিকার দিলেই সমাজে সমতা আসে না। অসম প্রতিযোগীদের মধ্যে একই নিয়ম প্রয়োগ করলে বৈষম্য আরও বৃদ্ধি পায়। উদাহরণস্বরূপ, একজন অত্যন্ত গরিব ও পিছিয়ে পড়া পরিবারের ছাত্র এবং একজন স্বচ্ছল ও অগ্রসর পরিবারের ছাত্রের মধ্যে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে শুরুর অবস্থানটি এক নয়। তাই রাষ্ট্র পিছিয়ে পড়া ছাত্রটির জন্য বিশেষ সুবিধা বা সংরক্ষণের ব্যবস্থা করে একটি সমতল ক্ষেত্র তৈরি করে দেয়।ভারতের সংবিধানে এই ইতিবাচক পদক্ষেপের একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ দেখা যায়।

ভারতীয় সমাজের ঐতিহাসিকভাবে পিছিয়ে পড়া তপশিলি জাতি, তপশিলি উপজাতি এবং অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণীর জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি চাকরিতে আসন সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর মাধ্যমে রাষ্ট্র সেই বঞ্চিত মানুষদের সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে নিয়ে আসার চেষ্টা করে। এটি আপাতদৃষ্টিতে বৈষম্য মনে হলেও, এটি আসলে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একটি পদ্ধতি।সমালোচকরা অনেক সময় বলেন যে এটি মেধার পরিপন্থী এবং এর ফলে যোগ্য প্রার্থীরা বঞ্চিত হতে পারে। এটিকে বিপরীত বৈষম্য বলেও সমালোচনা করা হয়। তবে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সকলের জন্য সামাজিক ন্যায়বিচার এবং রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধায় সমান অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করতে ইতিবাচক পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি। এটি কেবল কিছু মানুষের প্রতি দয়া নয়, বরং এটি হলো ঐতিহাসিক বঞ্চনার ক্ষতিপূরণ এবং একটি সাম্যভিত্তিক সমাজ গঠনের অপরিহার্য হাতিয়ার।

১৩। অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাঁচটি মূলনীতি কী কী?
(What are the five principles of economic development?)

উত্তর: অর্থনৈতিক উন্নয়ন বা ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট বলতে কেবল কোনো দেশের জাতীয় আয় বা মাথাপিছু আয় বৃদ্ধিকে বোঝায় না। এটি একটি বহুমাত্রিক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়, দারিদ্র্য দূর হয় এবং আর্থ-সামাজিক কাঠামোতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রধান পাঁচটি মূলনীতি নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:
১. সমতা ভিত্তিক প্রবৃদ্ধি: অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রথম এবং প্রধান মূলনীতি হলো সমতা বা ইক্যুইটি। কোনো দেশের অর্থনৈতিক বৃদ্ধি তখনই প্রকৃত উন্নয়নে পরিণত হয়, যখন সেই বৃদ্ধির সুফল সমাজের সকল স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছায়। দেশে যদি কেবল গুটিকয়েক ধনী ব্যক্তির সম্পদ বৃদ্ধি পায় এবং গরিবরা আরও গরিব হয়, তবে তাকে উন্নয়ন বলা যায় না। তাই সম্পদ ও আয়ের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা উন্নয়নের একটি অপরিহার্য নীতি।

২. দারিদ্র্য দূরীকরণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি: যেকোনো উন্নয়নশীল অর্থনীতির মূল লক্ষ্য হলো চরম দারিদ্র্যের অবসান ঘটানো। এর জন্য পর্যাপ্ত এবং সম্মানজনক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। মানুষ যদি কাজ পায় এবং তাদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ে, তবে তারা নিজেদের মৌলিক চাহিদাগুলো যেমন খাদ্য, বস্ত্র এবং বাসস্থান মেটাতে সক্ষম হয়, যা প্রকৃত অর্থনৈতিক উন্নয়নের ভিত্তি।

৩. মানব সম্পদের উন্নয়ন: অর্থনৈতিক উন্নয়ন কেবল কলকারখানা বা রাস্তাঘাট নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর একটি বড় অংশ হলো মানব মূলধনের ওপর বিনিয়োগ। শিক্ষা, উন্নত চিকিৎসাব্যবস্থা এবং জনস্বাস্থ্যের সার্বিক উন্নতির মাধ্যমে দেশের জনগণকে দক্ষ ও উৎপাদনশীল জনশক্তিতে পরিণত করা অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান নীতি। একজন সুস্থ ও শিক্ষিত নাগরিক দেশের অর্থনীতিতে অনেক বেশি অবদান রাখতে পারে।

৪. স্থিতিশীলতা বা টেকসই উন্নয়ন: আধুনিক যুগে উন্নয়নের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো টেকসই বা স্থিতিশীল উন্নয়ন (সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট)। এর অর্থ হলো, বর্তমান প্রজন্মের অর্থনৈতিক চাহিদা মেটাতে গিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংস করা যাবে না। পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখে, দূষণ রোধ করে এবং পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি করে যে অর্থনৈতিক অগ্রগতি সাধিত হয়, তাকেই প্রকৃত উন্নয়ন বলে।

৫. স্বনির্ভরতা ও প্রযুক্তিগত উন্নতি: একটি দেশকে প্রকৃত অর্থে উন্নত হতে হলে তাকে অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর হতে হয়। বিদেশি ঋণ বা সাহায্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নের পথে বাধা সৃষ্টি করে। পাশাপাশি, কৃষি, শিল্প এবং পরিষেবা ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি করা অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম নীতি। প্রযুক্তির উন্নয়ন কেবল উৎপাদনই বাড়ায় না, বরং কাজের গুণগত মানও উন্নত করে।

১৪। স্বাধীনতার বৈশিষ্ট্য আলোচনা কর। (Discuss the characteristics of liberty.)

উত্তর: স্বাধীনতা বা লিবার্টি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অন্যতম কেন্দ্রীয় ও জনপ্রিয় একটি ধারণা। সাধারণ অর্থে স্বাধীনতা বলতে নিজের ইচ্ছামতো কাজ করাকে বোঝালেও, রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্বাধীনতা বলতে এমন এক অনুকূল পরিবেশকে বোঝায় যেখানে ব্যক্তি তার নিজস্ব প্রতিভা ও ব্যক্তিসত্তার চরম ও পরম বিকাশ ঘটাতে পারে। স্বাধীনতার এই ধারণাকে সঠিকভাবে বুঝতে হলে এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো আলোচনা করা প্রয়োজন:

১.স্বাধীনতা অবাধ বা উচ্ছৃঙ্খলতা নয়: স্বাধীনতার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এটি কোনোভাবেই বাধাহীন বা যথেচ্ছাচার নয়। সমাজে বাস করে একজন ব্যক্তি যা খুশি তাই করার অধিকার পেতে পারে না। একজন মানুষের স্বাধীনতা তখনই অর্থবহ হয়, যখন সে অন্যের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ না করে নিজের অধিকার ভোগ করে। তাই স্বাধীনতা সর্বদা যুক্তিসঙ্গত নিয়ন্ত্রণের অধীন।

২.আইন হলো স্বাধীনতার রক্ষাকবচ: জন লক এবং অন্যান্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে, আইনের অনুপস্থিতি মানেই স্বাধীনতা নয়, বরং আইনই স্বাধীনতাকে রক্ষা করে ও তার পরিধি নির্ধারণ করে। রাষ্ট্রের তৈরি আইন মানুষের অবাধ ও ক্ষতিকারক ইচ্ছাকে নিয়ন্ত্রণ করে সমাজে এমন এক শৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে সবাই নির্ভয়ে তাদের স্বাধীনতা ভোগ করতে পারে।

৩.সাম্য ও অধিকারের সাথে সম্পর্কযুক্ত: স্বাধীনতা এবং সাম্য একে অপরের পরিপূরক। সমাজে যদি অর্থনৈতিক, সামাজিক বা রাজনৈতিক সাম্য না থাকে, তবে স্বাধীনতা কেবল ধনীদের একটি বিলাসী অধিকার হয়ে দাঁড়ায়। একইভাবে, রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত অধিকারগুলো বাস্তবে রূপায়িত হলেই মানুষ প্রকৃত স্বাধীনতা উপভোগ করতে পারে।

৪.ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক: স্বাধীনতার দুটি দিক রয়েছে। এর নেতিবাচক দিকটি হলো ব্যক্তির জীবনে রাষ্ট্র বা সমাজের অযাচিত হস্তক্ষপ বা বাধার অনুপস্থিতি। অন্যদিকে, ইতিবাচক দিকটি হলো রাষ্ট্র কর্তৃক এমন কিছু সুযোগ-সুবিধা ও পরিবেশ সৃষ্টি করা, যাতে সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষগুলোও তাদের ব্যক্তিসত্তার বিকাশ ঘটাতে পারে।

৫.রাষ্ট্রীয় সংরক্ষণ ও বিচারবিভাগের ভূমিকা: প্রকৃত স্বাধীনতা বজায় রাখার জন্য একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামো এবং একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থার উপস্থিতি একান্ত আবশ্যক। বিচারবিভাগ যদি স্বাধীন না হয়, তবে সরকার বা ক্ষমতাবান ব্যক্তিরা সাধারণ মানুষের স্বাধীনতা সহজেই হরণ করতে পারে। তাই স্বাধীনতাকে সুরক্ষিত রাখতে প্রাতিষ্ঠানিক রক্ষাকবচ অত্যন্ত জরুরি।

১৫। রাজনৈতিক তত্ত্ব বলতে কী বোঝায়? রাজনৈতিক তত্ত্বের প্রাসঙ্গিকতা আলোচনা কর। (২+৮)
(Define political theory. Discuss the relevance of political theory.)


উত্তর:
রাজনৈতিক তত্ত্ব:  রাজনৈতিক তত্ত্ব বা পলিটিক্যাল থিওরি হলো রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সেই শাখা যা রাষ্ট্র, সরকার, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান এবং মানুষের রাজনৈতিক আচরণ নিয়ে তাত্ত্বিক, বিজ্ঞানসম্মত এবং দর্শনভিত্তিক আলোচনা করে। প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জর্জ স্যাবাইনের মতে, রাজনৈতিক বিষয়াদি সম্পর্কে সুশৃঙ্খল ও যুক্তিনির্ভর অনুসন্ধানই হলো রাজনৈতিক তত্ত্ব। এটি কেবল বাস্তব রাজনীতিতে কী ঘটছে তার বর্ণনা বা বিশ্লেষণ করে না, বরং রাজনীতি ও সমাজকাঠামো কেমন হওয়া উচিত, তারও একটি আদর্শগত রূপরেখা প্রদান করে। ক্ষমতা, অধিকার, স্বাধীনতা, সাম্য এবং ন্যায়বিচারের মতো ধারণাগুলোর উৎপত্তি, বিকাশ এবং সমাজে এগুলোর প্রয়োগ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনাই রাজনৈতিক তত্ত্বের মূল বিষয়।
রাজনৈতিক তত্ত্বের প্রাসঙ্গিকতা: বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে কিছু রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রাজনৈতিক তত্ত্বের অবনমনের কথা বললেও, বর্তমান যুগে রাজনৈতিক তত্ত্বের প্রাসঙ্গিকতা, গুরুত্ব এবং উপযোগিতা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। একটি সুস্থ, গণতান্ত্রিক এবং সচেতন সমাজ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক তত্ত্বের ভূমিকা অপরিহার্য। নিচে রাজনৈতিক তত্ত্বের প্রাসঙ্গিকতা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:

১.রাজনৈতিক ধারণাগুলোর স্বচ্ছতা প্রদান:  আমরা দৈনন্দিন জীবনে স্বাধীনতা, সাম্য, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, ন্যায়বিচার বা জাতীয়তাবাদের মতো অসংখ্য রাজনৈতিক শব্দ ব্যবহার করি। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে এই ধারণাগুলোর অর্থ অনেক সময়ই অস্পষ্ট বা খণ্ডিত থাকে। রাজনৈতিক তত্ত্ব এই প্রতিটি ধারণার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, দার্শনিক ভিত্তি এবং বর্তমান তাৎপর্য পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করে। এর ফলে নাগরিকদের মনে রাজনৈতিক ধারণাগুলো সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও বিজ্ঞানসম্মত চিন্তাধারার বিকাশ ঘটে। একজন মানুষ যখন গণতন্ত্রের প্রকৃত অর্থ বুঝতে পারে, তখনই সে একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে সমাজে ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়।

২.সমসাময়িক রাজনৈতিক ও সামাজিক সমস্যার সমাধান:  মানবসমাজ প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল এবং এই পরিবর্তনের সাথে সাথে সমাজে নতুন নতুন সমস্যা ও দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। বর্ণবাদ, লিঙ্গ বৈষম্য, সাম্প্রদায়িকতা, অর্থনৈতিক অসাম্য বা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মতো সমস্যাগুলো বর্তমান বিশ্বের বাস্তব চিত্র। রাজনৈতিক তত্ত্ব কেবল এই সমস্যাগুলোর উৎপত্তি ও কারণ বিশ্লেষণ করে না, বরং অতীত ইতিহাস ও দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির ওপর ভিত্তি করে এই সমস্যাগুলো থেকে উত্তরণের একটি সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা প্রদান করে। এটি একটি আদর্শ সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় নীতি নির্ধারণে রাষ্ট্রনায়কদের সাহায্য করে।

৩.সরকারি নীতি ও রাষ্ট্রীয় কার্যাবলির মূল্যায়ন:   যেকোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকার জনগণের কল্যাণের জন্য বিভিন্ন নীতি ও আইন প্রণয়ন করে। কিন্তু সেই আইনগুলো প্রকৃত অর্থেই ন্যায়সঙ্গত কি না, বা সেগুলো সমাজের কোনো বিশেষ শ্রেণির ওপর বঞ্চনা চাপিয়ে দিচ্ছে কি না, তা বিচার করার মাপকাঠি হলো রাজনৈতিক তত্ত্ব। রাজনৈতিক তত্ত্বের জ্ঞান থাকলে নাগরিকরা সরকারের কাজের গঠনমূলক ও যুক্তিনির্ভর সমালোচনা করতে পারে। এটি রাষ্ট্রের স্বৈরাচারী প্রবণতাকে রোধ করে এবং সরকারকে সর্বদা জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য করে।

৪.সচেতন ও যুক্তিবাদী নাগরিক সমাজ গঠন:  গণতন্ত্রের সাফল্য নির্ভর করে নাগরিকদের রাজনৈতিক সচেতনতার ওপর। রাজনৈতিক তত্ত্ব নাগরিকদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করার পাশাপাশি রাষ্ট্রের প্রতি তাদের কর্তব্যগুলোও স্মরণ করিয়ে দেয়। এর ফলে মানুষের মধ্যে অন্ধভক্তি, কুসংস্কার এবং ধর্মীয় বা জাতিগত গোঁড়ামি দূর হয়। রাজনৈতিক তত্ত্ব পাঠের মাধ্যমে নাগরিকরা যুক্তিবাদী হয়ে ওঠে এবং সমাজের যেকোনো অন্যায় বা অবিচারের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক উপায়ে প্রতিবাদ করার অনুপ্রেরণা পায়।

৫.আন্তঃশৃঙ্খলামূলক ও আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রসার:   বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে রাজনৈতিক তত্ত্ব কেবল রাষ্ট্রের কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। পরিবেশ রক্ষা, নারীবাদ, মানবাধিকার, বিশ্বায়ন, এবং সাইবার সিকিউরিটির মতো আধুনিক বিষয়গুলো আজ রাজনৈতিক তত্ত্বের মূল আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে। পরিবেশবাদ আমাদের শেখায় কীভাবে প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রেখে উন্নয়ন করা যায়, নারীবাদ সমাজের পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর তত্ত্ব দেয়। এই নতুন বিষয়গুলোকে অন্তর্ভুক্ত করার ফলে রাজনৈতিক তত্ত্ব আধুনিক যুগের প্রতিটি সঙ্কটের মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

৬.ভবিষ্যৎ সমাজের রূপরেখা নির্মাণ:   রাজনৈতিক তত্ত্ব কেবল বর্তমানের সমালোচনা করে থেমে থাকে না, এটি ভবিষ্যতের একটি উন্নত ও সাম্যভিত্তিক সমাজের স্বপ্ন দেখায়। প্লেটো থেকে শুরু করে কার্ল মার্কস বা জন রলস প্রত্যেকেই তাদের তত্ত্বের মাধ্যমে একটি আদর্শ সমাজের মডেল তৈরি করার চেষ্টা করেছেন। যদিও বাস্তবে কোনো নিখুঁত সমাজ তৈরি করা অসম্ভব, কিন্তু রাজনৈতিক তত্ত্ব সেই আদর্শের দিকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য সমাজকে নিরন্তর প্রেরণা ও পথনির্দেশিকা জোগায়।

উপসংহারে বলা যায়, রাজনৈতিক তত্ত্ব কোনো মৃত বা অপ্রাসঙ্গিক বিষয় নয়। সমাজ যতদিন থাকবে, রাষ্ট্রের সাথে নাগরিকের সম্পর্ক যতদিন বজায় থাকবে এবং ক্ষমতা ও অধিকারের প্রশ্ন যতদিন প্রাসঙ্গিক থাকবে, রাজনৈতিক তত্ত্বও স্বমহিমায় টিকে থাকবে। রাজনীতিকে তার কলুষিত রূপ থেকে মুক্ত করে মানুষের সার্বিক কল্যাণের হাতিয়ার হিসেবে গড়ে তুলতে রাজনৈতিক তত্ত্বের চর্চা ও প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি।

১৬। সুশীল সমাজের বিভিন্ন ভূমিকা বিস্তারিত আলোচনা কর। (Discuss the various roles of civil society in detail.)

উত্তর:
ভূমিকা: সুশীল সমাজ বা সিভিল সোসাইটি হলো আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে, পরিবার ও রাষ্ট্রের মধ্যবর্তী স্থানে গড়ে ওঠা সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক, স্বেচ্ছামূলক এবং স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর সমষ্টিই হলো সুশীল সমাজ। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা (NGO), ট্রেড ইউনিয়ন, ছাত্র সংগঠন, নারী অধিকার গোষ্ঠী, পরিবেশবাদী সংগঠন এবং সচেতন নাগরিকদের নিয়ে এই সুশীল সমাজ গঠিত হয়। এটি মূলত রাষ্ট্রের ক্ষমতার বাইরে থেকে নাগরিকদের অধিকার রক্ষা এবং সামাজিক কল্যাণের উদ্দেশ্যে কাজ করে। একটি গণতান্ত্রিক দেশের রাজনীতি ও সমাজব্যবস্থায় সুশীল সমাজ বিভিন্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নিচে সাম্প্রতিক উদাহরণের সাহায্যে সুশীল সমাজের বিভিন্ন ভূমিকা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:

১.নাগরিক অধিকার ও স্বাধীনতা রক্ষা:   সুশীল সমাজের অন্যতম প্রধান কাজ হলো রাষ্ট্রের যেকোনো স্বৈরাচারী সিদ্ধান্ত বা ক্ষমতার অপব্যবহারের হাত থেকে সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার ও স্বাধীনতাকে রক্ষা করা। রাষ্ট্র যখন ক্ষমতার অহমিকায় সাধারণ মানুষের ওপর দমন-পীড়ন চালায়, তখন সুশীল সমাজ একত্রিত হয়ে তার তীব্র প্রতিবাদ করে এবং আইনি ও সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলে।সাম্প্রতিক উদাহরণ: ভারতে ২০২০-২০২১ সালের কৃষক আন্দোলন একটি অন্যতম বড় উদাহরণ, যেখানে সংযুক্ত কিষাণ মোর্চা এবং অন্যান্য কৃষক সংগঠনগুলো একত্রিত হয়ে রাষ্ট্রের বিতর্কিত কৃষি আইনের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী ও অহিংস আন্দোলন গড়ে তোলে। শেষ পর্যন্ত সরকার আইন প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। এছাড়াও পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রতিক আর.জি. কর হাসপাতালে চিকিৎসক ধর্ষণের ঘটনার প্রতিবাদে ডাক্তারদের সংগঠন, সাধারণ নাগরিক এবং বিভিন্ন মানবাধিকার গোষ্ঠী যেভাবে পথে নেমেছে, তা সুশীল সমাজের অধিকার আদায়ের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

২.সরকারি নীতি নির্ধারণে প্রভাব বিস্তার:  আধুনিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকার একা সব সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। সুশীল সমাজের বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ গোষ্ঠী, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং থিংক ট্যাংক সরকারের নীতি নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তারা বিভিন্ন বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করে, গবেষণা করে এবং সরকারের কাছে জনকল্যাণমুখী নীতি গ্রহণের জন্য লাগাতার চাপ সৃষ্টি করে।সাম্প্রতিক উদাহরণ: ভারতের অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্রেটিক রিফর্মস (এডিআর) নামক সংগঠনটির ভূমিকা এ ক্ষেত্রে উল্লেখ্যযোগ্য। এই সংগঠনটি দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনার জন্য লড়াই করেছে। সম্প্রতি তাদের দায়ের করা মামলার ভিত্তিতেই ভারতের সুপ্রিম কোর্ট রাজনৈতিক দলের চাঁদা সংগ্রহের অস্বচ্ছ ইলেকটোরাল বন্ড ব্যবস্থাকে অসাংবিধানিক বলে বাতিল ঘোষণা করেছে। এটি নীতি নির্ধারণ ও রাজনৈতিক স্বচ্ছতায় সুশীল সমাজের একটি বিশাল জয়।

৩.সমাজসেবা ও ত্রাণকার্য পরিচালনা:   সুশীল সমাজ কেবল রাষ্ট্রের বিরোধিতাই করে না, সমাজের গঠনমূলক ও সেবামূলক কাজেও এদের অবদান অপরিসীম। বিশেষ করে যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারী বা জরুরি অবস্থার সময় রাষ্ট্রীয় প্রশাসন যখন সব মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে না, তখন এই সংগঠনগুলো নিঃস্বার্থভাবে আর্তের সেবায় ঝাঁপিয়ে পড়ে।সাম্প্রতিক উদাহরণ: করোনা মহামারীর সময় রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ব্যর্থতার মাঝে খালসা এইড, রামকৃষ্ণ মিশন, ভারত সেবাশ্রম সংঘের মতো একাধিক সংগঠন এবং সাধারণ যুবকদের অক্সিজেন সাপ্লাই চেইন বা কমিউনিটি কিচেন তৈরির উদ্যোগ সুশীল সমাজের সেবামূলক ভূমিকার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এছাড়া সাম্প্রতিক বন্যায় ত্রিপুরা বা পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে স্বেচ্ছাসেবকদের ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার কাজ সমাজকল্যাণে তাদের গুরুত্ব প্রমাণ করে।

৪.পরিবেশ রক্ষা ও জনসচেতনতা বৃদ্ধি:   বর্তমানে পরিবেশ ধ্বংস ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিশাল সঙ্কটের মোকাবিলায় সুশীল সমাজ অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। সাধারণ মানুষকে তাদের পরিবেশগত অধিকার সম্পর্কে সচেতন করা এবং সরকারের যেকোনো পরিবেশ ধ্বংসকারী প্রকল্পের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর কাজটি পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোই করে থাকে।সাম্প্রতিক উদাহরণ: লাদাখের ভঙ্গুর পরিবেশ ও হিমবাহ রক্ষা করার জন্য পরিবেশকর্মী সোনম ওয়াংচুক এবং স্থানীয় সিভিল সোসাইটির নেতৃত্বে যে দীর্ঘ অনশন ও আন্দোলন চলছে, তা পরিবেশ রক্ষায় সুশীল সমাজের এক বিরাট পদক্ষেপ। একইভাবে মুম্বাইয়ে মেট্রো কারশেড নির্মাণের জন্য আরে বনাঞ্চল কাটার বিরুদ্ধে সাধারণ নাগরিক ও পরিবেশকর্মীদের তীব্র প্রতিবাদ সুশীল সমাজের পরিবেশ সচেতনতার এক চমৎকার উদাহরণ।

৫.স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও দুর্নীতি প্রতিরোধ:   যেকোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকার ও প্রশাসনের ওপর নজরদারি করা এবং তাদের দুর্নীতি মুক্ত রাখা সুশীল সমাজের একটি প্রধান দায়িত্ব। তথ্যের অধিকার কর্মী এবং বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম বা ফ্যাক্ট চেকিং ওয়েবসাইটগুলো প্রতিনিয়ত সরকারের কাজের পর্যালোচনা করে এবং সাধারণ মানুষের সামনে প্রকৃত তথ্য তুলে ধরে।সাম্প্রতিক উদাহরণ: বর্তমান যুগে অল্ট নিউজ (Alt News) এর মতো স্বাধীন তথ্য যাচাইকারী বা ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠানগুলো ভুয়ো খবর ও রাজনৈতিক অপপ্রচার রুখতে বিরাট ভূমিকা পালন করছে। একইভাবে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের আরটিআই (RTI) কর্মীরা নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্থানীয় পঞ্চায়েত বা মিউনিসিপ্যালিটির আর্থিক দুর্নীতির তথ্য জনসমক্ষে আনছেন। এর ফলে প্রশাসনের জবাবদিহিতা অনেকাংশে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, সুশীল সমাজ হলো যেকোনো গণতন্ত্রের প্রহরী বা পাহারাদার। রাষ্ট্র ও সাধারণ নাগরিকের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন তৈরি করে এই সুশীল সমাজ। একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন সুশীল সমাজ ছাড়া গণতন্ত্র কেবল ভোটের রাজনীতিতে পরিণত হয়। তাই নাগরিকদের সার্বিক অধিকার রক্ষা, সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের উন্নয়ন এবং একটি দুর্নীতিমুক্ত ও সংবেদনশীল সমাজ গঠনে সুশীল সমাজের এই বহুমাত্রিক ভূমিকা অত্যন্ত অপরিহার্য ও প্রশংসনীয়।


১৭। ভারতের রাজনীতিতে গণতন্ত্রের বিকাশ আলোচনা কর। (Discuss the development of democracy in Indian Politics.)


উত্তর:
ভূমিকা: ভারত হলো বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত হওয়ার পর, অসংখ্য ভাষা, ধর্ম, জাতি এবং ব্যাপক দারিদ্র্য ও অশিক্ষার মধ্যে দাঁড়িয়ে ভারত যখন সংসদীয় গণতন্ত্রের পথ বেছে নিয়েছিল, তখন পশ্চিমা বিশ্বের অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকই মনে করেছিলেন যে ভারতে গণতন্ত্র টিকবে না। কিন্তু সমস্ত জল্পনা ও প্রতিবন্ধকতাকে মিথ্যে প্রমাণ করে গত সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে ভারতের রাজনীতিতে গণতন্ত্র কেবল টিকেই থাকেনি, বরং সময়ের সাথে সাথে তার শিকড় আরও গভীরে প্রোথিত হয়েছে। ভারতের রাজনীতিতে এই গণতান্ত্রিক বিকাশের ধারাকে কয়েকটি ঐতিহাসিক পর্যায়ে ভাগ করে আলোচনা করা যেতে পারে।

১. নেহেরু যুগ ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি স্থাপন (১৯৪৭-১৯৬৪): স্বাধীনতার পর প্রথম দেড় দশক ছিল ভারতে গণতন্ত্রের ভিত গড়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরুর নেতৃত্বে ভারত সার্বজনীন প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকার গ্রহণ করে, যা ছিল তৎকালীন বিশ্বের নিরিখে এক বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত। এই সময়ে নির্বাচন কমিশন গঠিত হয় এবং ১৯৫১-৫২ সালে বিশ্বের বৃহত্তম ও সফল সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই যুগে কেন্দ্রে এবং রাজ্যগুলোতে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস দলের একাধিপত্য বা 'ওয়ান পার্টি ডোমিন্যান্স' ছিল। তবে কংগ্রেসের একচ্ছত্র আধিপত্য থাকা সত্ত্বেও নেহেরু সর্বদা বিরোধীদের সম্মান করতেন, সংসদে নিয়ম মেনে বিতর্ক হতো এবং বিচারবিভাগ ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছিল। এই প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিগুলোই ভারতে গণতন্ত্রের মজবুত ইমারত তৈরি করেছিল।

২. কংগ্রেস ব্যবস্থার পতন ও জোট রাজনীতির সূচনা (১৯৬৭-১৯৭১):  ১৯৬৪ সালে নেহেরুর মৃত্যুর পর ভারতের রাজনীতিতে এক বড় পরিবর্তন আসে। ১৯৬৭ সালের সাধারণ নির্বাচনে কংগ্রেস কেন্দ্রে ক্ষমতা ধরে রাখলেও অনেক রাজ্যে ক্ষমতা হারায়। আঞ্চলিক দলগুলো শক্তিশালী হতে শুরু করে এবং বিভিন্ন রাজ্যে অবিজেপি সরকার গঠিত হয়। এই পর্বটি ভারতীয় গণতন্ত্রের বিকাশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই সময়ে মানুষ বুঝতে পারে যে একটি বিশাল দলকে ক্ষমতাচ্যুত করা সম্ভব এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রকৃত স্বাদ মানুষ পেতে শুরু করে। রাজনীতিতে দলত্যাগ বা 'আয়া রাম গয়া রাম' সংস্কৃতিরও উদ্ভব হয় এই সময়েই।

৩. জরুরি অবস্থা ও গণতন্ত্রের পুনর্জাগরণ (১৯৭৫-১৯৭৭):  ১৯৭৫ সালের ২৫শে জুন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী দেশে অভ্যন্তরীণ জরুরি অবস্থা জারি করেন, যা ভারতীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়। এই সময়ে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়, বিরোধী নেতাদের বিনা বিচারে জেলে ঢোকানো হয় এবং সংবাদমাধ্যমের ওপর কঠোর সেন্সরশিপ আরোপ করা হয়। কিন্তু এই অন্ধকার অধ্যায়টি ভারতীয় গণতন্ত্রের শক্তিও প্রমাণ করে। ১৯৭৭ সালে জরুরি অবস্থা প্রত্যাহারের পর যখন নির্বাচন হয়, তখন সাধারণ গরিব ও অশিক্ষিত ভোটাররা তাদের গণতান্ত্রিক ক্ষমতার চরম ব্যবহার করে স্বৈরাচারী সরকারের পতন ঘটায় এবং কেন্দ্রে প্রথম অকংগ্রেসি সরকার (জনতা পার্টি) প্রতিষ্ঠা করে। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে ভারতীয় ভোটারদের গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রতি গভীর আস্থা রয়েছে।

৪. নব্বইয়ের দশক: সামাজিক ন্যায় ও জোট যুগের বিস্তার:নব্বইয়ের দশক ভারতীয় রাজনীতিতে তিনটি প্রধান শব্দ দ্বারা চিহ্নিত: মণ্ডল, মন্দির এবং মার্কেট। 'মণ্ডল কমিশন' এর সুপারিশ বাস্তবায়নের ফলে অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণীর (OBC) রাজনীতিতে ব্যাপক উত্থান ঘটে। দলিত, আদিবাসী এবং পিছিয়ে পড়া শ্রেণীর নেতারা ক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে আসেন, যা ভারতীয় গণতন্ত্রকে আরও বেশি প্রতিনিধিত্বমূলক ও অংশগ্রহণমূলক করে তোলে। অন্যদিকে অর্থনৈতিক উদারীকরণের (মার্কেট) ফলে দেশের অর্থনীতির রূপরেখা পালটে যায়। এই সময়ে কেন্দ্রে কোনো একক দল গরিষ্ঠতা না পাওয়ায় জোট রাজনীতির (Coalition Politics) এক দীর্ঘ যুগের সূচনা হয়। এনডিএ (NDA) এবং ইউপিএ (UPA) এর মতো বড় বড় জোট সরকার কেন্দ্রে সাফল্যের সাথে দেশ পরিচালনা করে, যা ভারতের ফেডারেল কাঠামো বা যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করে।

৫. সমসাময়িক যুগ ও একক দলের আধিপত্যের প্রত্যাবর্তন (২০১৪ - বর্তমান): ২০১৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসে, যা প্রায় তিন দশক পর কেন্দ্রে কোনো একক দলের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের ঘটনা। এই যুগে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসারের ফলে রাজনৈতিক প্রচার ও জনমত গঠনে সোশ্যাল মিডিয়ার অভূতপূর্ব প্রভাব দেখা যায়। প্রত্যক্ষ সুবিধা হস্তান্তর (Direct Benefit Transfer) এর মতো প্রযুক্তিনির্ভর কল্যাণমূলক প্রকল্পের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে সরকারি সুবিধা দ্রুত পৌঁছানোর ব্যবস্থা গণতন্ত্রের সেবামূলক দিকটিকে মজবুত করেছে।তবে সমসাময়িক এই পর্বে সমালোচকরা মনে করেন যে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চাপ বৃদ্ধি, বিরোধী স্বর দমনের প্রবণতা এবং ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতি ভারতীয় গণতন্ত্রের সামনে নতুন কিছু চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। অনেকেই একে 'গণতান্ত্রিক পশ্চাদপসরণ' বা ডেমোক্রেটিক ব্যাকস্লাইডিং এর যুগ বলেও উল্লেখ করেন।

উপসংহার:  সমস্ত ত্রুটি-বিচ্যুতি এবং চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও ভারতের রাজনীতিতে গণতন্ত্রের বিকাশ এক বিস্ময়কর সাফল্যের গল্প। নিরক্ষরতা, চরম দারিদ্র্য এবং বিশাল বৈচিত্র্য থাকা সত্ত্বেও ভারতের জনগণ বারবার নির্বাচনের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতার হস্তান্তর ঘটিয়েছে। নির্বাচন কমিশনের মতো স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা এবং সাধারণ ভোটারের ভোটদানের প্রতি প্রবল উৎসাহ প্রমাণ করে যে গণতন্ত্র আজ ভারতের রাজনৈতিক কাঠামোর একটি অবিচ্ছেদ্য এবং শক্তিশালী অংশ। ভারতীয় গণতন্ত্র প্রতিনিয়ত তার ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে বিকশিত হচ্ছে।

১৮। নাগরিকত্ব অর্জনের বিভিন্ন উপায়গুলি লেখ। (Write the various ways of acquiring citizenship.)

উত্তর:
ভূমিকা: রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোচনায় নাগরিকত্ব বা সিটিজেনশিপ হলো এমন এক আইনগত এবং রাজনৈতিক মর্যাদা, যার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি কোনো রাষ্ট্রের পূর্ণাঙ্গ সদস্য হিসেবে পরিগণিত হয়। একজন নাগরিক যেমন রাষ্ট্রের কাছ থেকে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার ভোগ করে, তেমনি তাকে রাষ্ট্রের প্রতি শর্তহীন আনুগত্য প্রদর্শন এবং কিছু নির্দিষ্ট কর্তব্য পালন করতে হয়। পৃথিবীতে প্রত্যেক রাষ্ট্র তার নিজস্ব সংবিধান ও আইন অনুযায়ী নাগরিকত্ব প্রদানের নিয়মকানুন নির্ধারণ করে। তবে সাধারণভাবে একজন ব্যক্তির নাগরিকত্ব অর্জনের উপায়গুলোকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়: স্বাভাবিক বা জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব অর্জন এবং কৃত্রিম বা অনুমোদন সাপেক্ষে নাগরিকত্ব অর্জন। নিচে নাগরিকত্ব অর্জনের বিভিন্ন উপায়গুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

ক. জন্মসূত্রে বা স্বাভাবিক নাগরিকত্ব অর্জন (Natural Citizenship):  বেশিরভাগ মানুষই জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব লাভ করে। জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব নির্ধারণের ক্ষেত্রে মূলত দুটি নীতি অনুসরণ করা হয়:

১. রক্তের সম্পর্ক নীতি (Jus Sanguinis):  এই নীতি অনুযায়ী, শিশু যেখানেই জন্মগ্রহণ করুক না কেন, তার নাগরিকত্ব নির্ধারিত হবে তার পিতা-মাতার নাগরিকত্ব দ্বারা। অর্থাৎ, পিতা-মাতা যদি ভারতীয় নাগরিক হন, তবে তাদের সন্তান পৃথিবীর যেকোনো দেশে জন্মগ্রহণ করলেও সে ভারতীয় নাগরিক বলেই গণ্য হবে। বিশ্বের অধিকাংশ দেশ, বিশেষ করে ভারত, ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড ইত্যাদি দেশ প্রধানত এই নীতি অনুসরণ করে।

২. জন্মস্থান নীতি (Jus Soli): এই নীতি অনুসারে, রক্তের সম্পর্ক যাই হোক না কেন, শিশুটি যে রাষ্ট্রের ভূখণ্ডে জন্মগ্রহণ করবে, সে সেই রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব লাভ করবে। উদাহরণস্বরূপ, যদি এক জোড়া ভারতীয় দম্পতির সন্তান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ করে, তবে জন্মস্থান নীতি অনুযায়ী সেই সন্তানটি জন্মগতভাবেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব লাভ করবে। আমেরিকা, আর্জেন্টিনা প্রভৃতি দেশ এই নীতি মেনে চলে। অনেক দেশ বর্তমানে এই দুটি নীতির মিশ্রণ ব্যবহার করে।

খ. অনুমোদন বা কৃত্রিম উপায়ে নাগরিকত্ব অর্জন (Acquired Citizenship):  যে পদ্ধতিতে জন্মসূত্রে নাগরিক না হওয়া সত্ত্বেও কোনো বিদেশি ব্যক্তি আইনের দ্বারা নির্ধারিত কিছু শর্ত পূরণ করে অন্য রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব লাভ করে, তাকে অনুমোদন সাপেক্ষে নাগরিকত্ব বলা হয়। এর বিভিন্ন পদ্ধতি রয়েছে:

১. বিবাহ:  কোনো ব্যক্তি যদি অন্য কোনো দেশের নাগরিককে বিবাহ করে, তবে সে সেই দেশের নাগরিকত্ব লাভের যোগ্য বলে বিবেচিত হতে পারে। যেমন, একজন বিদেশি নারী যদি একজন ভারতীয় পুরুষকে বিবাহ করেন, তবে তিনি নির্দিষ্ট সময় ভারতে বসবাসের পর আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভারতের নাগরিকত্ব লাভ করতে পারেন।
২. সরকারি চাকরি ও সম্পত্তি ক্রয়:   অনেক রাষ্ট্রে নিয়ম আছে যে, যদি কোনো বিদেশি ব্যক্তি সেই রাষ্ট্রের কোনো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি বা সামরিক পদে চাকরি গ্রহণ করে, তবে তাকে নাগরিকত্ব দেওয়া হয়। আবার কিছু কিছু দেশে (যেমন অনেক ইউরোপীয় বা ক্যারিবীয় দেশে) নির্দিষ্ট অঙ্কের সম্পত্তি বা রিয়েল এস্টেট ক্রয় করলে কিংবা সেদেশের অর্থনীতিতে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ করলে বিনিয়োগকারীকে নাগরিকত্ব প্রদান করা হয়।
৩. দীর্ঘকাল বসবাস এবং সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন (CAA) এর প্রেক্ষাপট:   কৃত্রিম নাগরিকত্ব অর্জনের একটি অন্যতম প্রধান উপায় হলো কোনো রাষ্ট্রে দীর্ঘকাল ধরে স্থায়ীভাবে বসবাস করা। সাধারণত একটি নির্দিষ্ট সময় (যেমন ভারত বা আমেরিকায় সাধারণত ১১ বা ১২ বছর) বৈধভাবে বসবাস করার পর বিদেশিরা নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারে।
                       সম্প্রতি ভারতে দীর্ঘকাল বসবাসের মাধ্যমে নাগরিকত্ব প্রদানের এই নিয়মে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও বিতর্কিত পরিবর্তন আনা হয়েছে সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন, ২০১৯ (CAA) এর মাধ্যমে। এই নতুন আইনের মাধ্যমে ভারত সরকার নিয়ম করেছে যে— পাকিস্তান, বাংলাদেশ এবং আফগানিস্তান থেকে যে সমস্ত হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি এবং খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী মানুষ ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার হয়ে ২০১৪ সালের ৩১শে ডিসেম্বরের আগে ভারতে প্রবেশ করেছে, তাদের আর আগের মতো ১১ বছর অপেক্ষা করতে হবে না। মাত্র ৫ বছর ভারতে বসবাস করলেই তারা ত্বরান্বিত পদ্ধতিতে (Fast-tracked) ভারতের নাগরিকত্ব পেয়ে যাবে। এই আইনের মাধ্যমে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ভারতে নাগরিকত্ব অর্জনের ক্ষেত্রে 'ধর্ম'-কে একটি মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, যার ফলে মুসলিমদের এই তালিকার বাইরে রাখা নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র আইনি ও সাংবিধানিক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।

৪. রাষ্ট্রীয় ভূখণ্ড সংযোজন:   কখনো কখনো কোনো রাষ্ট্র যদি যুদ্ধ জয় করে বা চুক্তির মাধ্যমে অন্য কোনো দেশের ভূখণ্ড নিজের সীমানার অন্তর্ভুক্ত করে নেয়, তবে সেই অন্তর্ভুক্ত এলাকার সমস্ত বাসিন্দা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নতুন রাষ্ট্রের নাগরিক হয়ে যায়। যেমন, ১৯৬১ সালে গোয়া ভারতের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর গোয়ার সমস্ত অধিবাসী ভারতীয় নাগরিকত্ব লাভ করেন। একইভাবে ১৯৭৫ সালে সিকিম ভারতের সাথে যুক্ত হলে সেখানকার মানুষ ভারতের নাগরিক হন।

৫. আবেদনের মাধ্যমে ও বিশেষ প্রতিভার স্বীকৃতি:  কোনো ব্যক্তি নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করে সরকারের কাছে নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারে। সরকার যাচাই করার পর তা অনুমোদন করতে পারে। এছাড়া শিল্প, বিজ্ঞান, সাহিত্য, বিশ্বশান্তি বা খেলাধুলার ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রাখা কোনো বিদেশিকে রাষ্ট্র সম্মানজনক নাগরিকত্ব (Honorary Citizenship) প্রদান করতে পারে। যেমন, মাদার তেরেসাকে বা আদনান সামিকে ভারত সরকার বিশেষ প্রক্রিয়ায় নাগরিকত্ব প্রদান করেছিল।

উপসংহার:  উপরিউক্ত আলোচনা থেকে বোঝা যায় যে, নাগরিকত্ব অর্জনের পদ্ধতিগুলো অত্যন্ত বৈচিত্র্যপূর্ণ। রাষ্ট্র নিজের সার্বভৌম ক্ষমতার জোরে, জনতাত্ত্বিক কাঠামো, জাতীয় নিরাপত্তা এবং বৈদেশিক নীতির ওপর ভিত্তি করে কাকে নাগরিকত্ব দেবে আর কাকে দেবে না, তা স্থির করে। জন্মসূত্রে পাওয়া নাগরিকত্ব হলো একটি স্বাভাবিক অধিকার, অন্যদিকে কৃত্রিম নাগরিকত্ব হলো রাষ্ট্রের আইন এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল একটি বিশেষ আইনি প্রক্রিয়া।


১৯। সংক্ষেপে সেন্সরশিপের বিরুদ্ধে বিতর্ক আলোচনা কর। (Briefly discuss the debate against censorship.)

উত্তর:
ভূমিকা:  সেন্সরশিপ বা নিয়ন্ত্রন ব্যবস্থা বলতে বোঝায় কোনো রাষ্ট্র, সরকার বা ক্ষমতাবান কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নাগরিকদের মতপ্রকাশ, সংবাদপত্র, বই, চলচ্চিত্র বা যেকোনো ধরণের শিল্পের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ। সরকার যখন মনে করে যে কোনো নির্দিষ্ট তথ্য বা বক্তব্য জনসমক্ষে এলে তা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করতে পারে, শাসকগোষ্ঠীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে পারে বা সমাজের নৈতিকতা নষ্ট করতে পারে, তখন সেই তথ্যের প্রচার বন্ধ করে দেওয়াই হলো সেন্সরশিপ। যদিও আধুনিক রাষ্ট্রগুলো জনশৃঙ্খলা রক্ষার যুক্তিতে সেন্সরশিপের পক্ষে সাফাই গায়, তবে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মতপ্রকাশের অবাধ স্বাধীনতা এবং সেন্সরশিপের মধ্যে চিরকালই এক গভীর দ্বন্দ্ব ও বিতর্ক বিদ্যমান।

                         সেন্সরশিপের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, সমাজকর্মী এবং চিন্তাবিদদের যে প্রধান যুক্তিগুলো রয়েছে, তা নিচে প্রাসঙ্গিক উদাহরণসহ বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. সত্য উদ্ঘাটন ও জ্ঞান বিকাশে চরম বাধা: সেন্সরশিপের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় দার্শনিক যুক্তিটি দিয়েছিলেন প্রখ্যাত চিন্তাবিদ জন স্টুয়ার্ট মিল। তাঁর মতে, কোনো মতকে সেন্সর করে বা জোর করে দাবিয়ে রেখে সমাজকে প্রকৃত সত্য থেকে বঞ্চিত করা হয়। একটি ভুল বা অপ্রিয় মতকেও জনসমক্ষে প্রকাশ করার অধিকার দেওয়া উচিত, কারণ যুক্তিতর্ক ও বিতর্কের মাধ্যমেই সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য স্পষ্ট হয়।উদাহরণ: ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, সপ্তদশ শতাব্দীতে বিজ্ঞানী গ্যালিলিও যখন বলেছিলেন যে পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে, তখন তৎকালীন চার্চ ও রাষ্ট্র তার এই বক্তব্যকে ধর্মবিরোধী আখ্যা দিয়ে সেন্সর করেছিল এবং তাকে গৃহবন্দী করেছিল। কিন্তু সেন্সরশিপ প্রয়োগ করে সাময়িকভাবে কণ্ঠ রোধ করা গেলেও, গ্যালিলিওর সেই বৈজ্ঞানিক সত্য আজ বিশ্বজুড়ে প্রতিষ্ঠিত। সুতরাং, সেন্সরশিপ মানুষের জ্ঞান ও বিজ্ঞানের বিকাশের পথে একটি বড় অন্তরায়।

২. গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নষ্ট করে:  গণতন্ত্রের মূল চালিকাশক্তি হলো একটি স্বাধীন সংবাদমাধ্যম এবং নির্ভীক বিরোধী স্বর। মানুষ যদি সরকারের ভুলত্রুটি সম্পর্কে জানতেই না পারে, তবে তারা সঠিক নেতৃত্ব নির্বাচন করতে পারবে না। সেন্সরশিপের মাধ্যমে সরকার মূলত তার নিজের দুর্নীতি, ব্যর্থতা এবং দমন-পীড়নের খবর সাধারণ মানুষের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখে। এর ফলে সরকার জনগণের কাছে জবাবদিহি করার দায় থেকে মুক্তি পায়, যা গণতন্ত্রকে স্বৈরতন্ত্রের দিকে ঠেলে দেয়।উদাহরণ: ১৯৭৫ সালে ভারতে জারি হওয়া জরুরি অবস্থার (Emergency) সময় সেন্সরশিপের নগ্ন রূপ দেখা গিয়েছিল। সংবাদপত্রে কী ছাপা হবে তা সরকারের সেন্সর বোর্ডের আধিকারিকরা ঠিক করে দিতেন। সরকারের দুর্নীতির খবর যাতে মানুষের কাছে না পৌঁছায় তার জন্য চরম ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। প্রতিবাদ স্বরূপ 'ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস' এবং 'দ্য স্টেটসম্যান'-এর মতো খবরের কাগজগুলো তাদের সম্পাদকীয় পাতা ফাঁকা (Blank Space) রেখে ছাপাত। এটি প্রমাণ করে যে সেন্সরশিপ কীভাবে গণতন্ত্রের আত্মাকে হত্যা করে।

৩. শিল্প, সাহিত্য ও সৃজনশীলতার কণ্ঠরোধ:  শিল্প, সাহিত্য এবং সিনেমা হলো সমাজের দর্পণ। এগুলোর মাধ্যমেই সমাজের লুক্কায়িত ক্ষোভ, অন্যায় এবং অন্ধকার দিকগুলো মানুষের সামনে ফুটে ওঠে। কিন্তু রাষ্ট্র অনেক সময় শালীনতা বা সমাজের ভাবাবেগ ক্ষুণ্ণ হওয়ার অজুহাত তুলে শিল্পের ওপর নির্মম সেন্সরশিপ চালায়। এর ফলে শিল্পীদের সৃজনশীলতা নষ্ট হয় এবং সমাজ তার নিজের সমস্যাগুলো অনুধাবন করার সুযোগ হারায়।উদাহরণ: সাম্প্রতিক ভারতের চলচ্চিত্রে সেন্সরশিপের একটি বড় উদাহরণ হলো ২০১৬ সালের সিনেমা 'উড়তা পাঞ্জাব' (Udta Punjab)। ভারতের পাঞ্জাব রাজ্যের যুবসমাজের মধ্যে মাদকের ভয়াবহ বিস্তার নিয়ে তৈরি এই সিনেমাটিতে রাজনৈতিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কায় সেন্সর বোর্ড ৮৯টি কাট বা দৃশ্য বাদ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল। পরে আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে সিনেমাটি মুক্তি পায় এবং সমাজের একটি গভীর ক্ষতকে মানুষের সামনে তুলে ধরে। সেন্সরশিপ থাকলে মানুষ এই বাস্তব চিত্রটি জানতেই পারত না।

৪. রাজনৈতিক ভিন্নমত ও সংখ্যালঘুদের কণ্ঠরোধের হাতিয়ার:   রাষ্ট্র প্রায়শই সেন্সরশিপকে 'জাতীয় নিরাপত্তা' বা 'জনশৃঙ্খলা' রক্ষার অজুহাতে ব্যবহার করে, কিন্তু বাস্তবে এটি মূলত রাজনৈতিক বিরোধী, মানবাধিকার কর্মী এবং সমাজের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিবাদী কণ্ঠকে স্তব্ধ করার জন্য ব্যবহৃত হয়। ক্ষমতাবান সরকার যেকোনো ভিন্নমতকেই দেশদ্রোহিতা হিসেবে তকমা দিয়ে সেন্সর করে দেয়।উদাহরণ: বর্তমানে ডিজিটাল সেন্সরশিপের যুগে ইন্টারনেট শাটডাউন (Internet Shutdown) একটি বড় সেন্সরশিপের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা বাতিলের সময় বা মণিপুরের সাম্প্রতিক জাতিগত দাঙ্গার সময় সরকার মাসের পর মাস ইন্টারনেট বন্ধ রেখেছিল। এর ফলে ওই অঞ্চলের সাধারণ মানুষ, সাংবাদিক এবং সমাজকর্মীদের বক্তব্য বহির্বিশ্বের কাছে পৌঁছাতে পারেনি। এটি এক ধরণের আধুনিক সেন্সরশিপ যা ভিন্নমতকে সম্পূর্ণ নিঃশব্দ করে দেয়।

৫. ভীতিপ্রদর্শন বা চিলিং এফেক্ট (Chilling Effect) সৃষ্টি:   সেন্সরশিপের সবচেয়ে ভয়ানক দিক হলো এটি সমাজে একটি ভীতির পরিবেশ বা 'চিলিং এফেক্ট' তৈরি করে। রাষ্ট্র যখন কোনো লেখক বা সাংবাদিককে সেন্সর করে বা জেলের ভয় দেখায়, তখন অন্যান্য সাংবাদিক, লেখক এবং সাধারণ নাগরিকরাও ভয় পেয়ে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে নিজেদের স্বাধীন চিন্তাকে আটকে রাখে, যাকে বলা হয় সেলফ-সেন্সরশিপ (Self-censorship)। 
উদাহরণ: ভারতের মতো দেশে রাষ্ট্রদ্রোহ আইন (Sedition Law) বা ইউএপিএ (UAPA) এর মতো কঠোর আইনগুলোর ভয়ে মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলো অনেক সময় সরকারের সরাসরি সমালোচনা করা থেকে বিরত থাকে। সাংবাদিকরা ভয় পান যে সত্য কথা বললে তাদের গ্রেপ্তার হতে হবে। এই ভয় মিশ্রিত সেলফ-সেন্সরশিপ একটি সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়।

উপসংহার:  পরিশেষে বলা যায়, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কোনো সমাজের জন্য বিলাসিতা নয়, বরং এটি মানুষের অস্তিত্ব ও সম্মানের ভিত্তি। যদিও এটি ঠিক যে সমাজে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য (Hate Speech) বা ভুয়ো খবর রোখার জন্য কিছু যৌক্তিক নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন রয়েছে, তবে সেই নিয়ন্ত্রণ কখনোই এমন হওয়া উচিত নয় যা সরকারের সমালোচনা বা সত্য প্রকাশকে বাধা দেয়। সেন্সরশিপের নামে রাষ্ট্রের একচেটিয়া ক্ষমতা প্রয়োগ মুক্ত সমাজ ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। তাই সেন্সরশিপের বিরুদ্ধে সচেতন নাগরিক সমাজের নিরন্তর সংগ্রাম যেকোনো প্রাণবন্ত গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত।

 ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য কিছু প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQs)

১. বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (VU) রাষ্ট্রবিজ্ঞানের (MJ A1) বিগত বছরের প্রশ্ন (PYQs) সলভ করা কেন জরুরি?

উত্তর: বিগত ৩-৫ বছরের প্রশ্নপত্র সমাধান করলে পরীক্ষার প্রশ্নের ধরন এবং কোন টপিকগুলো থেকে বারবার প্রশ্ন আসে, সে সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়। বিশেষ করে নতুন CCFUP (NEP 2020) কারিকুলামে কোন অধ্যায়গুলো বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তা বুঝতে PYQs-এর কোনো বিকল্প নেই।

উত্তর: সাধারণত বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী, ২ নম্বরের প্রশ্নের (বিভাগ ক) উত্তর ২-৩টি বাক্যে (সর্বোচ্চ ৪০-৫০ শব্দ), ৫ নম্বরের প্রশ্নের (বিভাগ খ) উত্তর ১৫০-২০০ শব্দের মধ্যে এবং ১০ নম্বরের প্রশ্নের (বিভাগ গ) উত্তর ৩০০-৪০০ শব্দের মধ্যে লেখা উচিত। তবে শব্দের চেয়ে উত্তরের গুণমান এবং সঠিক পয়েন্টের ওপর বেশি জোর দেওয়া প্রয়োজন।

উত্তর: বাধ্যতামূলক নয়, তবে ৫ এবং ১০ নম্বরের ব্রড প্রশ্নের ক্ষেত্রে প্যারাগ্রাফ করে লেখার চেয়ে পয়েন্ট (Points) ও সাব-পয়েন্ট (Sub-points) দিয়ে লিখলে নম্বর অনেক ভালো ওঠে। উত্তরের শুরুতে একটি প্রাসঙ্গিক ভূমিকা (Introduction) এবং শেষে একটি উপসংহার (Conclusion) দিলে খাতার মান বৃদ্ধি পায়।

উত্তর: হ্যাঁ, আপনি আপনার সুবিধামতো বাংলা অথবা ইংরেজি—যেকোনো একটি ভাষায় সম্পূর্ণ পেপারের উত্তর লিখতে পারেন। তবে একই পেপারে কিছু উত্তর বাংলায় এবং কিছু উত্তর ইংরেজিতে লেখা উচিত নয় (Technical terms ছাড়া)।

উত্তর: বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সম্পূর্ণ আপডেটেড সিলেবাস এবং সেমিস্টার অনুযায়ী স্টাডি মেটেরিয়ালস ও নোটস পেতে আমাদের ওয়েবসাইটের 'সিলেবাস' এবং 'নোটস' সেকশনে ভিজিট করতে পারো। এছাড়াও টপিক-ভিত্তিক ভিডিও আলোচনার জন্য Polity Politics ইউটিউব চ্যানেলটি দেখতে পারো।

Scroll to Top