বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয় UG 2nd Sem VAC 02 হিউম্যান রাইটস / মানবাধিকার কোর্সের বিগত বছরের সেমিস্টার পরীক্ষার প্রশ্নোত্তর (Vidyasagar University VAC 2 Human Rights Solved PYQ)
বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করার জন্য বিগত বছরের প্রশ্ন (PYQ) সমাধান করা অত্যন্ত জরুরি। অনেক সময়ই আগের বছরের প্রশ্ন পরীক্ষায় পুনরাবৃত্তি (repeat) হয়।
নিচে বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ভ্যালু অ্যাডেড কোর্স’ (VAC 2) – মানবাধিকার বা Human Rights পেপারের পূর্ববর্তী সেমিস্টারান্তিক (Semester End) পরীক্ষার ২ নম্বরের সংক্ষিপ্ত প্রশ্নগুলির সহজ ও সঠিক উত্তর দেওয়া হলো।আগামী পরীক্ষার চূড়ান্ত প্রস্তুতির জন্য এই প্রশ্নোত্তরগুলি মনোযোগ সহকারে পড়ে নেওয়া প্রয়োজন।
প্রশ্নোত্তর (Question-Answer)
VU 2nd Semester Examination 2025
বিভাগ খ – Group B প্রতিটি প্রশ্নের মান ৫
১০. স্বাস্থ্যের অধিকারের উদ্দেশ্য কী? (What are the purpose of the Right to Health)
ভূমিকা:
মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে ‘স্বাস্থ্যের অধিকার’ (Right to Health) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক অধিকার। ১৯৪৮ সালের মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্রের (UDHR) ২৫ নম্বর ধারা এবং রাষ্ট্রসংঘের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার সংক্রান্ত চুক্তিতে (ICESCR) প্রতিটি মানুষের সর্বোচ্চ সম্ভাব্য শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য লাভের অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ভারতের সংবিধানেও ২১ নম্বর ধারায় বর্ণিত ‘জীবনের অধিকার’-এর (Right to Life) একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হলো স্বাস্থ্যের অধিকার।
স্বাস্থ্যের অধিকারের মূল উদ্দেশ্যসমূহ:
স্বাস্থ্যের অধিকার প্রতিষ্ঠার পেছনে বেশ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য কাজ করে। যথা—
১. সর্বজনীন স্বাস্থ্য পরিষেবা নিশ্চিত করা (Universal Health Coverage): স্বাস্থ্যের অধিকারের প্রধান উদ্দেশ্য হলো সমাজে ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষের জন্য পর্যাপ্ত, সহজলভ্য এবং মানসম্মত চিকিৎসা পরিষেবা নিশ্চিত করা। কেউ যেন অর্থের অভাবে বা দূরত্বের কারণে জীবনদায়ী চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত না হয়, তা দেখাই এই অধিকারের প্রাথমিক লক্ষ্য।
২. বৈষম্য দূরীকরণ ও সমতা বিধান: স্বাস্থ্য পরিষেবার ক্ষেত্রে লিঙ্গ, জাতি, ধর্ম, বা আর্থ-সামাজিক অবস্থার ভিত্তিতে সমস্ত রকম বৈষম্য দূর করা এর অন্যতম উদ্দেশ্য। বিশেষ করে নারী, শিশু, বয়স্ক এবং সমাজের প্রান্তিক বা পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য সুরক্ষা সুনিশ্চিত করতে এই অধিকার বিশেষ জোর দেয়।
৩. প্রতিরোধমূলক ও নিরাময়মূলক ব্যবস্থার প্রসার: স্বাস্থ্যের অধিকার কেবল অসুখ হলে চিকিৎসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর উদ্দেশ্য হলো মহামারী, সংক্রামক (যেমন— কোভিড-১৯, ম্যালেরিয়া) এবং অসংক্রামক রোগগুলি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি ও তা প্রতিরোধ করা, টিকাকরণের ব্যবস্থা করা এবং অসুস্থ হলে তার সঠিক নিরাময়মূলক চিকিৎসা প্রদান করা।
৪. মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্যের উন্নয়ন: গর্ভবতী নারীদের সঠিক যত্ন, নিরাপদ প্রসবের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক পরিকাঠামো এবং শিশুদের সঠিক পুষ্টি ও স্বাস্থ্য নিশ্চিত করার মাধ্যমে মাতৃমৃত্যু (MMR) ও শিশুমৃত্যুর হার (IMR) কমানো স্বাস্থ্যের অধিকারের একটি অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।
৫. স্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও আনুষঙ্গিক উপাদানের নিশ্চয়তা: সুস্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য মৌলিক উপাদানগুলি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া স্বাস্থ্যের অধিকারের বৃহত্তর উদ্দেশ্যের অন্তর্ভুক্ত। এর মধ্যে রয়েছে— নিরাপদ ও পরিশ্রুত পানীয় জল, পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার, উন্নত স্যানিটেশন বা পরিচ্ছন্নতা এবং দূষণমুক্ত বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করা।
উপসংহার:
পরিশেষে বলা যায়, স্বাস্থ্যের অধিকারের উদ্দেশ্য কেবল রোগ বা অসুস্থতার অনুপস্থিতি নয়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে এর উদ্দেশ্য হলো একজন মানুষের সম্পূর্ণ শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক কল্যাণ (Well-being) নিশ্চিত করা। একটি সুস্থ মানবসম্পদ ছাড়া কোনো জাতির সামগ্রিক উন্নয়ন এবং মানবাধিকারের সম্মানজনক প্রতিষ্ঠা কখনোই সম্ভব নয়।
১১. মানবাধিকার রক্ষায় নাগরিক সমাজের ভূমিকা কী? (Role of Civil Society in Protecting Human Rights)
ভূমিকা:
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ‘নাগরিক সমাজ’ (Civil Society) রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে। রাষ্ট্রসংঘের মতে, নাগরিক সমাজ হলো এমন একটি ক্ষেত্র যেখানে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা, এনজিও (NGO), সংবাদমাধ্যম, ছাত্র সংগঠন এবং সাধারণ নাগরিকরা সঙ্ঘবদ্ধভাবে অধিকার রক্ষায় কাজ করে। মানবাধিকার সুরক্ষা কেবল রাষ্ট্রের কাজ নয়, বরং নাগরিক সমাজ এখানে ‘প্রহরী’ (Watchdog) হিসেবে কাজ করে।
মানবাধিকার রক্ষায় নাগরিক সমাজের ভূমিকা: নাগরিক সমাজ মূলত নিম্নলিখিত উপায়ে মানবাধিকার রক্ষায় অংশগ্রহণ করে:
১. নজরদারি ও তথ্য সংগ্রহ (Monitoring and Documentation): নাগরিক সমাজের অন্যতম প্রধান কাজ হলো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলি পর্যবেক্ষণ করা এবং তার সঠিক তথ্য সংগ্রহ করা। অনেক সময় রাষ্ট্র বা পুলিশ কোনো অপরাধ ধামাচাপা দিতে চাইলে, নাগরিক সমাজের বিভিন্ন সংগঠন (যেমন— PUCL বা Amnesty International) তথ্য অনুসন্ধান বা ‘ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং’ করে সত্যটি সামনে আনে।
২. জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও শিক্ষা (Awareness and Education): সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষ অনেক সময় তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকে না। নাগরিক সমাজ সেমিনার, পথনাটক, এবং কর্মশালার মাধ্যমে মানুষকে তাদের আইনি অধিকার সম্পর্কে শিক্ষিত করে। এর ফলে সাধারণ মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে শেখে।
৩. আইনি লড়াই ও জনস্বার্থ মামলা (Public Interest Litigation – PIL): দরিদ্র বা অসহায় মানুষের পক্ষে সরাসরি আদালতে যাওয়া সম্ভব হয় না। নাগরিক সমাজ বা মানবাধিকার কর্মীরা তাদের হয়ে আদালতে জনস্বার্থ মামলা দায়ের করে। উদাহরণস্বরূপ, ভারতের সুপ্রিম কোর্টে বহু যুগান্তকারী রায় (যেমন— কাস্টোডিয়াল ডেথ বা পরিবেশ দূষণ রোধ) সম্ভব হয়েছে নাগরিক সমাজের সক্রিয়তায়।
৪. সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি (Advocacy and Lobbying): নাগরিক সমাজ সরকারের ত্রুটিপূর্ণ নীতি বা কালাকানুন পরিবর্তনের জন্য চাপ সৃষ্টি করে। উদাহরণস্বরূপ, ভারতে ‘তথ্য জানার অধিকার আইন’ (RTI Act, 2005) প্রবর্তনে নাগরিক সমাজের ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য।
৫. প্রান্তিক গোষ্ঠীর অধিকার রক্ষা: নারী, শিশু, দলিত, আদিবাসী এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিশেষ মানবাধিকার নিশ্চিত করতে নাগরিক সমাজ ঢাল হিসেবে কাজ করে।
সাম্প্রতিক উদাহরণ (Recent Examples):
কোভিড-১৯ মহামারী: মহামারীর সময় যখন অনেক মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার (Right to Life) সংকটে পড়েছিল, তখন বিভিন্ন অ-সরকারি সংস্থা (NGO) খাদ্য, অক্সিজেন এবং চিকিৎসার ব্যবস্থা করে মানবাধিকার রক্ষা করেছিল।
পরিবেশ সুরক্ষা: হাসদেও অরণ্য রক্ষা (Save Hasdeo) বা সুন্দরবন রক্ষার আন্দোলনে নাগরিক সমাজের ভূমিকা সাম্প্রতিককালে দেখা গেছে।
আন্তর্জাতিক সূচক: ‘V-Dem Institute’-এর সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে বিশ্বে নাগরিক সমাজের কাজের পরিসর (Civil Society Space) সংকুচিত হয়েছে, যা মানবাধিকার সুরক্ষার ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
নাগরিক সমাজের ভূমিকার সমালোচনা (Criticism)নাগরিক সমাজের অনেক ইতিবাচক দিক থাকা সত্ত্বেও এর কিছু সীমাবদ্ধতা বা সমালোচনা রয়েছে:
১. আর্থিক উৎস ও স্বচ্ছতা (Funding and Transparency): অনেক সময় নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলোর (বিশেষ করে এনজিও) বিরুদ্ধে স্বচ্ছতার অভাবের অভিযোগ ওঠে। বিদেশি অনুদান গ্রহণ (FCRA-এর মাধ্যমে) নিয়ে সরকারের সাথে প্রায়ই সংঘাত দেখা দেয়। অভিযোগ করা হয় যে, বিদেশি অর্থে দেশের উন্নয়নমূলক কাজ ব্যাহত করা হচ্ছে।
২. রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্টতা: অনেক নাগরিক সমাজ সংগঠন কোনো একটি বিশেষ রাজনৈতিক আদর্শ দ্বারা প্রভাবিত হয়। এর ফলে তাদের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
৩. শহরকেন্দ্রিকতা (Urban Bias): অধিকাংশ বড় মানবাধিকার সংগঠন শহরভিত্তিক। গ্রামীণ বা প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রান্তিক মানুষের কাছে এই সংগঠনগুলোর পৌঁছানোর ক্ষমতা অনেক ক্ষেত্রেই সীমিত।
৪. পেশী শক্তির অভাব: নাগরিক সমাজের কাছে কোনো প্রশাসনিক বা আইনি প্রয়োগ ক্ষমতা (Executive power) নেই। তারা কেবল সুপারিশ করতে পারে বা আন্দোলন করতে পারে, কিন্তু আইন প্রয়োগের জন্য তাদের রাষ্ট্রের ওপরই নির্ভর করতে হয়।
মূল্যায়ন (Conclusion)
পরিশেষে বলা যায়, নাগরিক সমাজের সক্রিয়তা ছাড়া মানবাধিকার রক্ষা করা অসম্ভব। যদিও সাম্প্রতিককালে FCRA (Foreign Contribution Regulation Act, 2020) সংশোধনের ফলে অনেক এনজিও (যেমন— Oxfam India, Amnesty India) সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে, তবুও গণতন্ত্রকে জীবন্ত রাখতে এবং রাষ্ট্রের স্বৈরাচারী মনোভাব দমন করতে নাগরিক সমাজের ভূমিকা অপরিহার্য। একটি শক্তিশালী নাগরিক সমাজই পারে মানুষের মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করতে।
