বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয় ভারতীয় সংবিধান (MDC 01) বিগত বছরের প্রশ্নোত্তর | Vidyasagar University - VU Indian Constitution PYQ & Notes in Bengali

Vidyasagar University-এর UG 1st Semester (CCFUP-NEP)-এর ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য এই পোস্টে Indian Constitution MDC 01 সিলেবাসের Previous Years’ Questions (PYQs) & Answers বাংলা ভাষায় (Bangla Notes) আলোচনা করা হলো।


স্নাতক প্রথম সেমিস্টার (Indian Constitution MDC 01) ভারতীয় সংবিধান — বিগত বছরের প্রশ্ন ও উত্তর
Vidyasagar University UG 1st Semester  Examination (NEP-CCFUP) 2025
Subject: Indian Constitution
Paper: MDC 1-T
Time: 2 Hours                                                                               Full Marks:40

১। গণপরিষদের দু'জন বিশিষ্ট সদস্যের নাম উল্লেখ করো।
(Mention the names of two prominent members of the Constituent Assembly.)


উত্তর: স্বাধীন ভারতের সংবিধান রচনার উদ্দেশ্যে গঠিত গণপরিষদ বা সংবিধান সভার অনেক বিশিষ্ট সদস্য ছিলেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম দু'জন উল্লেখযোগ্য সদস্য হলেন ডঃ বি. আর. আম্বেদকর এবং পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু। এছাড়া ডঃ রাজেন্দ্র প্রসাদ এবং সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলও এই সভার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন।

২। কবে এবং কততম সংবিধান সংশোধনের মধ্যে দিয়ে ভারতীয় সংবিধানের প্রস্তাবনায় 'ধর্মনিরপেক্ষ' শব্দটি সংযুক্ত করা হয়েছিল?
(When and through which constitutional amendment was the word 'secular' added to the preamble of the Indian Constitution?)


উত্তর: ১৯৫০ সালে যখন ভারতের মূল সংবিধান কার্যকর হয়, তখন প্রস্তাবনায় 'ধর্মনিরপেক্ষ' শব্দটি ছিল না। পরবর্তীকালে ১৯৭৬ সালে ৪২তম সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে প্রস্তাবনায় এই শব্দটি আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত করা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্রের চোখে সব ধর্মকে সমান মর্যাদা দেওয়া এবং রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে ধর্মের প্রভাব থেকে নিরপেক্ষ থাকা।


৩। মৌলিক অধিকার ও রাষ্ট্রপরিচালনার নির্দেশমূলক নীতিসমূহের মধ্যে যে-কোনো দু'টি পার্থক্য উল্লেখ করো।
(Mention any two differences between Fundamental Rights and Directive Principles of State Policy.)

উত্তর: প্রথমত, মৌলিক অধিকারগুলি আদালত দ্বারা বলবৎযোগ্য, অর্থাৎ অধিকার লঙ্ঘিত হলে নাগরিকরা আদালতের দ্বারস্থ হতে পারেন, কিন্তু নির্দেশমূলক নীতিগুলি আদালত দ্বারা বলবৎযোগ্য নয়। দ্বিতীয়ত, মৌলিক অধিকারের প্রধান লক্ষ্য হলো দেশে রাজনৈতিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা, অন্যদিকে নির্দেশমূলক নীতিগুলির মূল উদ্দেশ্য হলো দেশে আর্থ-সামাজিক গণতন্ত্র এবং জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র গড়ে তোলা।


৪। অর্থ বিল কী? (What is a Money Bill?)

উত্তর: ভারতীয় সংবিধানের ১১০ নম্বর ধারা অনুযায়ী, যে বিলে কোনো নতুন কর আরোপ, কর বাতিল, কর পরিবর্তন বা ভারত সরকারের ঋণ গ্রহণ ও সঞ্চিত তহবিল সংক্রান্ত বিষয়গুলি উল্লেখিত থাকে, তাকে অর্থ বিল বলা হয়। এই বিল কেবলমাত্র লোকসভাতেই উত্থাপন করা যায় এবং এতে রাষ্ট্রপতির আগাম সম্মতি প্রয়োজন হয়। কোনো বিল অর্থ বিল কি না, সে বিষয়ে লোকসভার স্পিকারের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হয়।

৫। 'বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনা' বলতে তুমি কী বোঝো?
(What do you understand by 'Judicial Review'?)

উত্তর: বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনা হলো সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টের এমন একটি বিশেষ ক্ষমতা যার মাধ্যমে তারা আইনসভা প্রণীত কোনো আইন বা শাসনবিভাগের নির্দেশিকা সংবিধান সম্মত কি না তা পরীক্ষা করে দেখতে পারে। যদি দেখা যায় যে ওই আইনটি সংবিধানের পরিপন্থী বা নাগরিকদের মৌলিক অধিকার খর্ব করছে, তবে আদালত তাকে বাতিল বা অবৈধ ঘোষণা করতে পারে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো সংবিধানের প্রাধান্য এবং পবিত্রতা রক্ষা করা।

৬। লোকসভা কীভাবে গঠিত হয়? (How is the Lok Sabha formed?)

উত্তর: ভারতীয় সংসদের নিম্নকক্ষ বা লোকসভা সরাসরি প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকদের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা গঠিত হয়। সংবিধানে এর সর্বোচ্চ সদস্য সংখ্যা ৫৫২ জন নির্ধারিত হলেও বর্তমানে এটি ৫৪৩ জন সদস্য নিয়ে গঠিত, যাঁরা বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকা থেকে প্রত্যক্ষভাবে নির্বাচিত হন। লোকসভার স্বাভাবিক মেয়াদ পাঁচ বছর এবং সভার কাজকর্ম পরিচালনার জন্য সদস্যরা নিজেদের মধ্য থেকে একজনকে স্পিকার হিসেবে নির্বাচন করেন।

৭। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হওয়ার যোগ্যতাগুলি কী কী?
(What are the qualifications to become a judge of the Supreme Court of India?)


উত্তর: সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হতে গেলে কোনো ব্যক্তিকে সর্বপ্রথম অবশ্যই ভারতের নাগরিক হতে হবে। তাকে কোনো হাইকোর্টে অন্তত পাঁচ বছর বিচারপতি হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে অথবা কোনো হাইকোর্টে অন্তত দশ বছর আইনজীবী হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। এছাড়া রাষ্ট্রপতির মতে যদি তিনি একজন বিশিষ্ট আইনজ্ঞ হন, তবে তিনিও সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন।

৮। লোক আদালত কী? (What is Lok Adalat?)

উত্তর:
লোক আদালত হলো ভারতের এক বিশেষ ধরনের বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা বা জনগণের আদালত, যেখানে আপস-মীমাংসা এবং আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত ও কম খরচে বিভিন্ন মামলার সমাধান করা হয়। যেসব মামলা আদালতে দীর্ঘদিন ধরে বিচারাধীন আছে বা যেসব বিরোধ এখনও আদালতে দায়ের হয়নি, সেগুলি এখানে দু'পক্ষের সম্মতিতে মেটানো হয়। লোক আদালতের রায় চূড়ান্ত হিসেবে গণ্য হয় এবং এর বিরুদ্ধে সাধারণত কোনো আপিল করা যায় না।


বিভাগ খ * Group B * প্রতিটি প্রশ্নের মান ৫ (যে-কোনো দুইটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে)

৯। ভারতীয় নাগরিকদের মৌলিক কর্তব্যগুলির উপর একটি সংক্ষিপ্ত টীকা লেখো।
(Write a short note on the fundamental duties of Indian citizens.)


উত্তর:
ভারতীয় সংবিধানে নাগরিকদের অধিকারের পাশাপাশি দেশ ও সমাজের প্রতি তাদের কিছু অবশ্য পালনীয় দায়িত্ব বা কর্তব্যের কথাও বলা হয়েছে, যেগুলি মৌলিক কর্তব্য নামে পরিচিত। ১৯৫০ সালের মূল সংবিধানে এই কর্তব্যের কোনো উল্লেখ ছিল না। পরবর্তীকালে ১৯৭৬ সালে সরণ সিং কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে ৪২তম সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের চতুর্থ-ক অংশে অর্থাৎ পার্ট ফোর-এ এবং ৫১-ক ধারায় মোট ১০টি মৌলিক কর্তব্য যুক্ত করা হয়। পরে ২০০২ সালে ৮৬তম সংশোধনীর মাধ্যমে আরও একটি নতুন কর্তব্য যুক্ত হওয়ায় বর্তমানে মোট মৌলিক কর্তব্যের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১টি। এই ধারণাটি মূলত প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের সংবিধান থেকে গ্রহণ করা হয়েছিল। নাগরিকদের প্রধান কয়েকটি মৌলিক কর্তব্যের মধ্যে
প্রথমটি হলো সংবিধানকে মান্য করা এবং জাতীয় পতাকা ও জাতীয় সঙ্গীতের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা।
দ্বিতীয়ত, দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের মহান আদর্শগুলিকে সর্বদা স্মরণ ও অনুসরণ করা।
তৃতীয়ত, ভারতের সার্বভৌমত্ব, ঐক্য ও সংহতিকে রক্ষা করা এবং দেশরক্ষার কাজে প্রয়োজনবোধে সাড়া দেওয়া।
এছাড়া দেশের সব মানুষের মধ্যে ধর্ম, ভাষা বা অঞ্চলের ভেদাভেদ ভুলে সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে তোলা এবং নারীর মর্যাদা হানিকর প্রথাগুলি বর্জন করা নাগরিকদের অন্যতম কর্তব্য।
নাগরিকদের আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্যের মধ্যে রয়েছে দেশের মিশ্র সংস্কৃতির ঐতিহ্যকে সম্মান ও সংরক্ষণ করা। বনভূমি, নদী, বন্যপ্রাণীসহ সমগ্র প্রাকৃতিক পরিবেশের সংরক্ষণ করা এবং জীবজগতের প্রতি সহানুভূতি দেখানো। বিজ্ঞানমনস্কতা, মানবতাবাদ এবং অনুসন্ধিৎসা গড়ে তোলাও একটি বিশেষ দায়িত্ব। দেশের যাবতীয় সরকারি বা জাতীয় সম্পত্তি রক্ষা করা এবং সব ধরনের সহিংসতা থেকে নিজেকে দূরে রাখা প্রত্যেক নাগরিকের অবশ্য কর্তব্য।
সর্বশেষ এবং একাদশ কর্তব্যটি হলো, ৬ থেকে ১৪ বছর বয়সী প্রত্যেক শিশুকে শিক্ষার সুযোগ করে দেওয়া, যা পিতা-মাতা বা অভিভাবকের প্রাথমিক দায়িত্ব।
এই মৌলিক কর্তব্যগুলি সরাসরি আদালতের দ্বারা বলবৎযোগ্য নয়, অর্থাৎ কেউ এগুলি পালন না করলে তাকে আইনি শাস্তি দেওয়া যায় না। তা সত্ত্বেও এই কর্তব্যগুলির একটি গভীর নৈতিক এবং শিক্ষামূলক মূল্য রয়েছে। এগুলি নাগরিকদের সচেতন করে তোলে যে, অধিকার ভোগ করার পাশাপাশি দেশের প্রতি তাদের কিছু চরম দায়িত্বও রয়েছে, যা একটি শক্তিশালী ও সুশৃঙ্খল জাতি গঠনে একান্ত অপরিহার্য।



১০। প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিপরিষদের মধ্যে সম্পর্ক সংক্ষেপে আলোচনা করো।
(Discuss briefly the relationship between the Prime Minister and the Council of Ministers.)

উত্তর: ভারতের সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিপরিষদের মধ্যে সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড় এবং একে অপরের পরিপূরক। তাত্ত্বিকভাবে দেশের শাসনক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে থাকলেও, সংবিধানে বলা হয়েছে যে রাষ্ট্রপতিকে সাহায্য ও পরামর্শ দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি মন্ত্রিপরিষদ থাকবে। এই মন্ত্রিপরিষদ এবং প্রধানমন্ত্রীর সুসম্পর্ক ও সমন্বয়ের ওপরই সরকারের সামগ্রিক সাফল্য নির্ভর করে। লর্ড মর্লে প্রধানমন্ত্রীকে সমকক্ষদের মধ্যে প্রথম বলে অভিহিত করেছেন, তবে বাস্তবে মন্ত্রিপরিষদে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা অনেক বেশি ব্যাপক ও নিরঙ্কুশ।

প্রথমত, মন্ত্রিপরিষদ গঠনের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছাই চূড়ান্ত। প্রধানমন্ত্রী তাঁর দলের যোগ্য সদস্যদের নিয়ে একটি তালিকা তৈরি করেন এবং রাষ্ট্রপতি কেবল সেই তালিকা অনুযায়ীই মন্ত্রীদের নিয়োগ করেন। কোন মন্ত্রী কোন দপ্তরের দায়িত্ব পাবেন তা প্রধানমন্ত্রীই নির্ধারণ করেন এবং প্রয়োজন মনে করলে তিনি যেকোনো মন্ত্রীর দপ্তর পরিবর্তন করতে পারেন। মন্ত্রিপরিষদ মূলত ক্যাবিনেট মন্ত্রী, রাষ্ট্রমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের নিয়ে গঠিত হয় এবং এই তিন স্তরের মন্ত্রীদের মধ্যে কাজের সমন্বয় সাধন করেন প্রধানমন্ত্রী।

দ্বিতীয়ত, ক্যাবিনেট বা মন্ত্রিপরিষদের যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী সভাপতিত্ব করেন। সভার আলোচ্যসূচি কী হবে এবং কোন বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, তা মূলত তাঁর নির্দেশেই স্থির হয়। মন্ত্রীদের মধ্যে কোনো বিষয়ে মতবিরোধ দেখা দিলে প্রধানমন্ত্রীই চূড়ান্ত মীমাংসা করে দেন। তিনি মন্ত্রিপরিষদ এবং রাষ্ট্রপতির মধ্যে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম হিসেবে কাজ করেন এবং সরকারের যাবতীয় সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করেন।

তৃতীয়ত, কোনো মন্ত্রীর কাজে প্রধানমন্ত্রী অসন্তুষ্ট হলে তিনি তাকে পদত্যাগ করতে বলতে পারেন। যদি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী পদত্যাগ করতে অস্বীকার করেন, তবে প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে তাকে বরখাস্ত করাতে পারেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের অর্থ হলো সমগ্র মন্ত্রিপরিষদের পতন। একজন সাধারণ মন্ত্রীর পদত্যাগে সরকারের পতন ঘটে না, কিন্তু প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করলে বা তাঁর মৃত্যু হলে পুরো সরকারকে বিদায় নিতে হয়।

সবশেষে বলা যায়, মন্ত্রিপরিষদ হলো একটি দল বা টিম আর প্রধানমন্ত্রী হলেন সেই টিমের ক্যাপ্টেন। মন্ত্রিপরিষদের যৌথ দায়িত্বশীলতার নীতি অনুযায়ী কোনো দপ্তরের ভালো কাজের কৃতিত্ব যেমন সমগ্র সরকারের, তেমনি ব্যর্থতার দায়ও সবার। এই যৌথ দায়িত্বশীলতা বজায় রাখা এবং মন্ত্রীদের নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশ পরিচালনা করাই হলো প্রধানমন্ত্রীর প্রধান কাজ। 

১১। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের আপিল এলাকা ব্যাখ্যা করো।
(Explain the appellate jurisdiction of the Supreme Court of India.)

উত্তর: ভারতের সুপ্রিম কোর্ট হলো দেশের সর্বোচ্চ আপিল আদালত। দেশের যেকোনো হাইকোর্ট বা ট্রাইব্যুনালের রায়ে সন্তুষ্ট না হলে নির্দিষ্ট কিছু শর্ত সাপেক্ষে নাগরিকরা সুপ্রিম কোর্টে আপিল করতে পারেন। ভারতীয় সংবিধানে ১৩২ নম্বর থেকে ১৩৬ নম্বর ধারার মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের আপিল এলাকা বা আপিলেট জুরিসডিকশন সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

সুপ্রিম কোর্টের এই আপিল এলাকাকে মূলত চারটি ভাগে ভাগ করা যায়: সাংবিধানিক আপিল, দেওয়ানি আপিল, ফৌজদারি আপিল এবং বিশেষ অনুমতির মাধ্যমে আপিল।প্রথমত, সাংবিধানিক আপিল বা ১৩২ নম্বর ধারা বলতে বোঝায় যখন কোনো মামলার সঙ্গে সংবিধানের ব্যাখ্যামূলক কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন জড়িয়ে থাকে। যদি কোনো হাইকোর্ট রায় দেওয়ার পর এই মর্মে একটি শংসাপত্র বা সার্টিফিকেট দেয় যে মামলাটিতে সংবিধান ব্যাখ্যার প্রয়োজন রয়েছে, তবে সেই রায়ের বিরুদ্ধে সরাসরি সুপ্রিম কোর্টে আপিল করা যায়।

দ্বিতীয়ত, দেওয়ানি আপিল বা ১৩৩ নম্বর ধারা হলো সিভিল বা সাধারণ মামলা সংক্রান্ত আপিল। আগে শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট আর্থিক মূল্যের বেশি হলেই দেওয়ানি মামলায় সুপ্রিম কোর্টে আপিল করা যেত। কিন্তু বর্তমানে আর্থিক মূল্যের কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। হাইকোর্ট যদি মনে করে যে কোনো দেওয়ানি মামলায় সাধারণ আইনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন জড়িত আছে এবং সুপ্রিম কোর্ট দ্বারাই তার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হওয়া উচিত, তবে সেই ক্ষেত্রে আপিল করা যায়।

তৃতীয়ত, ফৌজদারি আপিল বা ১৩৪ নম্বর ধারা বা ক্রিমিনাল মামলার ক্ষেত্রেও আপিল করা যায়। যদি নিম্ন আদালত কোনো আসামিকে বেকসুর খালাস দেয় কিন্তু হাইকোর্ট সেই রায়ের বিরুদ্ধে গিয়ে আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেয়, তবে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করা যায়। এছাড়া হাইকোর্ট যদি নিম্ন আদালত থেকে কোনো মামলা নিজের হাতে তুলে নিয়ে আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেয়, সেক্ষেত্রে আপিল করা অধিকার হিসেবে গণ্য হয়। এর বাইরেও হাইকোর্ট শংসাপত্র দিলে অন্যান্য ফৌজদারি আপিল করা সম্ভব।

চতুর্থত, বিশেষ অনুমতির মাধ্যমে আপিল বা ১৩৬ নম্বর ধারা। এটি সুপ্রিম কোর্টের একটি বিশেষ ও অসীম ক্ষমতা। সামরিক আদালত বা ট্রাইব্যুনাল ছাড়া ভারতের ভূখণ্ডের মধ্যে অবস্থিত যেকোনো আদালত বা ট্রাইব্যুনালের যেকোনো রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্ট নিজের বিশেষ ক্ষমতাবলে সরাসরি আপিলের অনুমতি বা স্পেশাল লিভ পিটিশন মঞ্জুর করতে পারে। এর ফলে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের দরজা সাধারণ মানুষের জন্য সবসময় খোলা থাকে।


১২। একটি অঙ্গরাজ্যের রাজ্যপালের ক্ষমতা ও কার্যাবলী সংক্ষেপে আলোচনা করো।
(Discuss briefly the powers and functions of the Governor of a state.)

উত্তর: ভারতের সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় কেন্দ্র সরকারের মতো অঙ্গরাজ্যগুলিতেও সংসদীয় রীতির প্রবর্তন করা হয়েছে। এই কাঠামোয় রাজ্যের শাসনতান্ত্রিক ও নিয়মতান্ত্রিক প্রধান হলেন রাজ্যপাল। তাত্ত্বিকভাবে রাজ্যের যাবতীয় শাসনকার্য তাঁর নামেই পরিচালিত হয়, যদিও বাস্তবে তিনি মুখ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিপরিষদের পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করেন। একজন রাজ্যপালকে রাষ্ট্রপতি ৫ বছরের জন্য নিয়োগ করেন।

রাজ্যপালের ক্ষমতা ও কার্যাবলীকে প্রধানত চারটি ভাগে ভাগ করা যায়: শাসনবিভাগীয়, আইনবিভাগীয়, অর্থবিভাগীয় এবং স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা।
A. শাসনবিভাগীয় ক্ষমতার ক্ষেত্রে রাজ্যপাল রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে নিয়োগ করেন এবং মুখ্যমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে অন্যান্য মন্ত্রীদের নিয়োগ করেন। রাজ্যের অ্যাডভোকেট জেনারেল, রাজ্য পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সভাপতি ও অন্যান্য সদস্যদের তিনি নিয়োগ করেন। রাজ্যের শাসনকাজ কীভাবে চলছে, সে বিষয়ে তিনি মুখ্যমন্ত্রীর কাছ থেকে যাবতীয় তথ্য জানতে চাইতে পারেন। রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হলে তিনি রাষ্ট্রপতির কাছে রাজ্যে জরুরি অবস্থা বা রাষ্ট্রপতি শাসন জারির সুপারিশ করতে পারেন।

B. আইনবিভাগীয় ক্ষমতার দিক থেকে রাজ্যপাল রাজ্য আইনসভার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিনি আইনসভার অধিবেশন আহ্বান করতে পারেন, স্থগিত রাখতে পারেন এবং মুখ্যমন্ত্রীর পরামর্শে বিধানসভা ভেঙেও দিতে পারেন। আইনসভার অধিবেশনের শুরুতে তিনি ভাষণ দেন। রাজ্য আইনসভায় পাশ হওয়া যেকোনো বিল তাঁর সম্মতি ছাড়া আইনে পরিণত হতে পারে না। তিনি চাইলে কোনো বিলে সম্মতি দিতে পারেন, পুনরায় বিবেচনার জন্য ফেরত পাঠাতে পারেন অথবা রাষ্ট্রপতির বিবেচনার জন্য বিলটি সংরক্ষিত রাখতে পারেন। বিধানসভার অধিবেশন বন্ধ থাকলে জরুরি প্রয়োজনে তিনি অধ্যাদেশ বা অর্ডিন্যান্স জারি করতে পারেন।

C. অর্থবিভাগীয় ক্ষমতার ক্ষেত্রে রাজ্যপালের পূর্বানুমতি ছাড়া রাজ্য বিধানসভায় কোনো অর্থ বিল পেশ করা যায় না। তাঁর নির্দেশেই রাজ্যের অর্থমন্ত্রী প্রতি আর্থিক বছরে রাজ্য আইনসভায় বার্ষিক বাজেট পেশ করেন। রাজ্যের আকস্মিক ব্যয় তহবিল বা কন্টিনজেন্সি ফান্ড রাজ্যপালের নিয়ন্ত্রণাধীন থাকে এবং জরুরি প্রয়োজনে তিনি সেখান থেকে অর্থ মঞ্জুর করতে পারেন।

D. রাজ্যপালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা হলো তাঁর স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা। সংবিধান অনুযায়ী কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে রাজ্যপালকে মন্ত্রিপরিষদের পরামর্শ মেনে চলতে হয় না। বিধানসভা নির্বাচনে কোনো দল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে মুখ্যমন্ত্রী নিয়োগের ক্ষেত্রে তিনি নিজের বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করেন। এছাড়া কোনো বিল রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো বা রাজ্যে ৩৫৬ ধারা জারির সুপারিশ করার ক্ষেত্রে তিনি সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন।



বিভাগ গ * Group C * প্রতিটি প্রশ্নের মান ১০ (যে-কোনো দুইটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে)

১৩। ভারতের সংবিধান প্রণয়নে গণপরিষদের ভূমিকার মূল্যায়ন করো।

ভূমিকা: ভারতের শাসনতান্ত্রিক ইতিহাসে সংবিধান রচনার জন্য গঠিত গণপরিষদ বা সংবিধান সভার (Constituent Assembly) ভূমিকা অবিস্মরণীয়। ১৯৪৬ সালের ক্যাবিনেট মিশন পরিকল্পনার ভিত্তিতে এই গণপরিষদ গঠিত হয়েছিল। ভারতের সংবিধান কোনো একক ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীর এক দিনের সৃষ্টি নয়, বরং এটি গণপরিষদের দীর্ঘ প্রায় তিন বছরের অক্লান্ত পরিশ্রম, আলোচনা এবং ঐকমত্যের একটি প্রামাণ্য দলিল। একটি সদ্য স্বাধীন দেশের জন্য উপযুক্ত গণতান্ত্রিক কাঠামো তৈরিতে গণপরিষদের ভূমিকা নিচে মূল্যায়ন করা হলো।

১. প্রতিনিধিত্বমূলক কাঠামোর সৃষ্টি:  গণপরিষদের সদস্যরা সরাসরি জনগণের দ্বারা নির্বাচিত না হলেও, প্রাদেশিক আইনসভার সদস্যদের মাধ্যমে তারা পরোক্ষভাবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। শুরুতে এর সদস্য সংখ্যা ৩৮৯ জন থাকলেও দেশভাগের পর তা ২৯৯ জনে দাঁড়ায়। এই সভায় ভারতের সমস্ত ধর্ম (হিন্দু, মুসলিম, শিখ, পার্সি, খ্রিস্টান) এবং তফসিলি জাতি ও উপজাতির বিশিষ্ট প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন, যা গণপরিষদকে একটি প্রকৃত সর্বভারতীয় চরিত্র প্রদান করেছিল।

২. উদ্দেশ্যমূলক প্রস্তাবের মাধ্যমে দিশানির্দেশ:  ১৯৪৬ সালের ১৩ই ডিসেম্বর জওহরলাল নেহরু গণপরিষদে ঐতিহাসিক 'উদ্দেশ্যমূলক প্রস্তাব' (Objective Resolution) উত্থাপন করেন। এই প্রস্তাবে স্বাধীন ভারতকে একটি সার্বভৌম, গণতান্ত্রিক ও সাধারণতন্ত্র হিসেবে গড়ে তোলার রূপরেখা দেওয়া হয়। সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ন্যায়বিচার এবং সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষার যে প্রতিশ্রুতি এই প্রস্তাবে ছিল, তা গণপরিষদের ভবিষ্যৎ কাজের মূল ভিত্তি স্থাপন করে এবং পরবর্তীকালে সংবিধানের প্রস্তাবনায় পরিণত হয়।

৩. বিকেন্দ্রীকরণ ও বিভিন্ন কমিটি গঠন:  সংবিধান রচনার মতো বিশাল ও জটিল কাজকে সুচারুভাবে সম্পন্ন করার জন্য গণপরিষদ ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের পথ বেছে নেয়। মোট ২২টি বিভিন্ন কমিটি গঠন করা হয়, যার মধ্যে কেন্দ্রীয় ক্ষমতা কমিটি, প্রাদেশিক সংবিধান কমিটি, এবং মৌলিক অধিকার সংক্রান্ত কমিটি অন্যতম। এই কমিটিগুলি নির্দিষ্ট বিষয়ে গভীর গবেষণা করে তাদের খসড়া রিপোর্ট পেশ করত।

৪. খসড়া কমিটির অসামান্য অবদান:  গণপরিষদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কমিটি ছিল ড. বি. আর. আম্বেদকরের নেতৃত্বাধীন সাত সদস্যের খসড়া কমিটি (Drafting Committee)। ১৯৪৭ সালের ২৯শে আগস্ট গঠিত এই কমিটি বিভিন্ন সাব-কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে সংবিধানের একটি পূর্ণাঙ্গ ও আইনি কাঠামোগত খসড়া তৈরি করে। ড. আম্বেদকরের অসাধারণ আইনি প্রজ্ঞা ও যুক্তিপূর্ণ ব্যাখ্যার কারণেই তাঁকে ভারতীয় সংবিধানের জনক বলা হয়।

৫. ব্যাপক আলোচনা, বিতর্ক ও স্বচ্ছতা:  গণপরিষদের কাজের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল এর গণতান্ত্রিক পদ্ধতি। খসড়া সংবিধানের প্রতিটি ধারা, উপধারা এবং শব্দ নিয়ে দীর্ঘ ও পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। প্রায় ৭,৬৩৫টি সংশোধনী প্রস্তাব জমা পড়েছিল, যার মধ্যে ২,৪৭৩টি নিয়ে সভায় সরাসরি বিতর্ক হয়। দেশের সাধারণ মানুষ ও সংবাদমাধ্যমের মতামতের জন্য খসড়াটি উন্মুক্ত রাখা হয়েছিল।

৬. ঐকমত্য বা কনসেনসাস প্রতিষ্ঠা:  বিবিধ মতাদর্শের সংঘাত থাকা সত্ত্বেও গণপরিষদ সাধারণ ভোটাভুটির বদলে পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং ঐকমত্যের (Consensus) ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছিল। ভাষা নীতি, কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক বা সংরক্ষণ নীতির মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলিতে নেতারা ছাড় দেওয়ার মানসিকতা দেখিয়েছিলেন, যা ভারতের বৈচিত্র্যময় সমাজকে এক সুতোয় বাঁধতে সাহায্য করেছিল।

৭. বিশ্বজনীন অভিজ্ঞতার সফল প্রয়োগ:  গণপরিষদের সদস্যরা পৃথিবীর প্রায় ৬০টি দেশের সংবিধান পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পাঠ করেছিলেন। ব্রিটেনের সংসদীয় ব্যবস্থা, আমেরিকার মৌলিক অধিকার, আয়ারল্যান্ডের নির্দেশমূলক নীতি এবং কানাডার যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর মতো বিভিন্ন সংবিধানের ইতিবাচক দিকগুলি তাঁরা ভারতের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে মানানসই করে গ্রহণ করেছিলেন।

৮. নমনীয়তা ও অনমনীয়তার ভারসাম্য:  গণপরিষদ এমন একটি সংবিধান রচনা করেছিল যা খুব বেশি অনমনীয় বা খুব বেশি পরিবর্তনশীল নয়। ভবিষ্যতের আইনপ্রণেতারা যাতে সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে সংবিধানকে যুগোপযোগী করতে পারেন, তার জন্য ৩৬৮ নম্বর ধারায় একটি ভারসাম্যপূর্ণ সংশোধন পদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।

উপসংহার:  পরিশেষে বলা যায়, ভারতের সংবিধান প্রণয়নে গণপরিষদের ভূমিকা কেবল একটি আইনি খসড়া তৈরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ১১টি অধিবেশনে ২ বছর ১১ মাস ১৮ দিন ধরে নিরলস পরিশ্রমের মাধ্যমে গণপরিষদ একটি স্বাধীন, ধর্মনিরপেক্ষ ও কল্যাণকামী রাষ্ট্রের দৃঢ় ভিত্তি স্থাপন করেছিল। ১৯৪৯ সালের ২৬শে নভেম্বর গৃহীত এই সংবিধান গত সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে ভারতের গণতন্ত্রকে সফলভাবে ধারণ করে রেখেছে, যা গণপরিষদের দূরদর্শিতারই চরম প্রমাণ।



১৪। ভারতীয় সংবিধানে লিপিবদ্ধ স্বাধীনতার অধিকারটি আলোচনা করো।


ভূমিকা:
  গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় নাগরিকদের ব্যক্তিত্বের পূর্ণ বিকাশ এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনের জন্য স্বাধীনতা হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। ভারতের সংবিধানে মৌলিক অধিকারের অধ্যায়ে, অর্থাৎ তৃতীয় অংশে ১৯ নম্বর ধারা থেকে ২২ নম্বর ধারার মধ্যে নাগরিকদের 'স্বাধীনতার অধিকার' (Right to Freedom) অত্যন্ত বিস্তারিতভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। এই অধিকার স্বৈরাচারী রাষ্ট্রশক্তির হস্তক্ষেপ থেকে নাগরিকদের রক্ষা করে।

১. বাক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা (১৯(১)(ক) ধারা):  সংবিধানের ১৯ নম্বর ধারায় মূলত ছয়টি গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে, যার মধ্যে প্রথমটি হলো বাক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। এর অর্থ হলো প্রত্যেক নাগরিক নিজের মতামত স্বাধীনভাবে প্রকাশ করতে পারবেন। সাম্প্রতিককালে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, তথ্য জানার অধিকার (RTI), এমনকি ইন্টারনেটে মতপ্রকাশের অধিকারকেও এই ধারার অন্তর্ভুক্ত বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

২. সমবেত হওয়া ও সংঘ গঠনের অধিকার (১৯(১)(খ) ও (গ) ধারা):  ভারতের যেকোনো নাগরিক শান্তিপূর্ণভাবে এবং অস্ত্রশস্ত্র ছাড়া একত্রিত বা সমবেত হতে পারবেন। এছাড়া, নাগরিকদের বিভিন্ন সমিতি, ইউনিয়ন বা সমবায় গঠন করার পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। এই অধিকারের ভিত্তিতেই দেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, শ্রমিক সংগঠন এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে।

৩. চলাফেরা, বসবাস ও বৃত্তির স্বাধীনতা (১৯(১)(ঘ), (ঙ), (চ) ধারা):  ভারতের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে যেকোনো স্থানে অবাধে চলাফেরা করা এবং স্থায়ীভাবে বসবাস করার অধিকার নাগরিকদের রয়েছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে ১৯(১)(চ) ধারা, যা অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিক তার পছন্দমতো যেকোনো আইনসম্মত পেশা, বৃত্তি বা ব্যবসা গ্রহণ করতে পারবেন।

৪. যুক্তিসঙ্গত বিধিনিষেধের প্রয়োগ:  সংবিধানে প্রদত্ত এই স্বাধীনতাগুলি অবাধ বা শর্তহীন নয়। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা বা নৈতিকতার স্বার্থে রাষ্ট্র আইনের মাধ্যমে এই স্বাধীনতাগুলির ওপর যুক্তিসঙ্গত বিধিনিষেধ (Reasonable Restrictions) আরোপ করতে পারে।

৫. অপরাধের ক্ষেত্রে আইনি সুরক্ষা (২০ নম্বর ধারা):   ২০ নম্বর ধারায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। প্রথমত, আইনভঙ্গের সময় যে আইন বলবৎ ছিল, তার চেয়ে বেশি শাস্তি কোনো ব্যক্তিকে দেওয়া যাবে না। দ্বিতীয়ত, একই অপরাধের জন্য কোনো ব্যক্তিকে একাধিকবার শাস্তি দেওয়া বা বিচার করা যাবে না (Double Jeopardy)। তৃতীয়ত, কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তিকে নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করা যাবে না।

৬. জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার (২১ নম্বর ধারা):  এটি ভারতীয় সংবিধানের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ধারা। এতে বলা হয়েছে যে, আইন নির্দিষ্ট পদ্ধতি ছাড়া অন্য কোনোভাবে কোনো ব্যক্তিকে তার জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। মেনকা গান্ধী মামলা এবং সাম্প্রতিককালের পুত্তাস্বামী মামলার (২০১৭) রায়ের পর সুপ্রিম কোর্ট এই ধারার পরিধি ব্যাপক হারে বৃদ্ধি করেছে। বর্তমানে স্বাস্থ্যকর পরিবেশের অধিকার, দ্রুত বিচারের অধিকার এবং 'গোপনীয়তার অধিকার' (Right to Privacy) ২১ নম্বর ধারার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্বীকৃত।

৭. শিক্ষার অধিকার (২১-ক ধারা):   শিক্ষাকে একটি মৌলিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে ২০০২ সালে ৮৬তম সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে ২১-ক ধারাটি যুক্ত করা হয়। এই ধারা অনুযায়ী, ৬ থেকে ১৪ বছর বয়সী সমস্ত শিশুর জন্য অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের আইনি দায়িত্ব। এর ভিত্তিতেই ২০০৯ সালে 'শিক্ষার অধিকার আইন' (RTE Act) পাস হয়।

৮. গ্রেপ্তার ও আটকের বিরুদ্ধে সুরক্ষা (২২ নম্বর ধারা):   এই ধারা অনুযায়ী, সাধারণ আইনে গ্রেপ্তার হওয়া কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের কারণ দ্রুত জানাতে হবে এবং তাকে নিজের পছন্দের আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করার সুযোগ দিতে হবে। গ্রেপ্তারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাকে নিকটতম ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করা বাধ্যতামূলক। তবে নিবর্তনমূলক আটক আইনে (Preventive Detention) গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বা বিদেশি শত্রুদের ক্ষেত্রে এই নিয়মগুলি প্রযোজ্য হয় না।

উপসংহার:  উপরিউক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, সংবিধানে লিপিবদ্ধ স্বাধীনতার অধিকার অত্যন্ত ব্যাপক এবং মানবাধিকারের একটি শক্তিশালী দলিল। এটি যেমন ব্যক্তি স্বাধীনতাকে সুনিশ্চিত করেছে, তেমনি বৃহত্তর সমাজ ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তার স্বার্থে প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণেরও ব্যবস্থা রেখেছে। ব্যক্তি ও সমাজের মধ্যে একটি সুন্দর ভারসাম্য রক্ষাই হলো এই অধিকারের মূল নির্যাস।



১৫। ভারতের রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও পদমর্যাদার সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ করো।


ভূমিকা:   
ভারতের সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি হলেন রাষ্ট্রের নিয়মতান্ত্রিক বা সাংবিধানিক প্রধান এবং দেশের প্রথম নাগরিক। সংবিধানের ৫৩ নম্বর ধারা অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় সরকারের যাবতীয় শাসনক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যস্ত করা হয়েছে এবং সরকারের সমস্ত কাজকর্ম তাঁর নামেই পরিচালিত হয়। তবে সংবিধানে তাঁর ক্ষমতা যতই ব্যাপক হোক না কেন, বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে তাঁর পদমর্যাদা নিয়ে নানা বিতর্ক রয়েছে।

রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও কার্যাবলী:
১. ব্যাপক শাসনবিভাগীয় ক্ষমতা:   রাষ্ট্রপতি লোকসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ করেন এবং প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে অন্যান্য মন্ত্রীদের নিয়োগ ও দপ্তর বণ্টন করেন। এছাড়া তিনি ভারতের অ্যাটর্নি জেনারেল, মহা হিসাবরক্ষক (CAG), সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টের বিচারপতি, রাজ্যপাল, নির্বাচন কমিশনার এবং ইউপিএসসি (UPSC)-র চেয়ারম্যানদের মতো দেশের সমস্ত উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের নিয়োগ করেন।

২. আইনবিভাগীয় ও অধ্যাদেশ জারির ক্ষমতা:   রাষ্ট্রপতি ভারতীয় সংসদের একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। তিনি সংসদের উভয় কক্ষের অধিবেশন আহ্বান করেন, স্থগিত রাখেন এবং প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে লোকসভা ভেঙে দিতে পারেন। সংসদে পাস হওয়া কোনো বিল তাঁর স্বাক্ষর ছাড়া আইনে পরিণত হয় না। সংসদ বন্ধ থাকাকালীন দেশের জরুরি প্রয়োজনে তিনি ১২৩ নম্বর ধারা অনুযায়ী অর্ডিন্যান্স বা অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন, যার আইনি ক্ষমতা সাধারণ আইনের মতোই।

৩. অর্থ ও সামরিক ক্ষমতা:   রাষ্ট্রপতির পূর্বানুমতি ছাড়া লোকসভায় কোনো অর্থ বিল বা বাজেট পেশ করা যায় না। দেশের আকস্মিক ব্যয় তহবিল তাঁর হাতে ন্যস্ত থাকে। এছাড়া তিনি হলেন ভারতের সশস্ত্র বাহিনীর (স্থল, নৌ এবং বিমান বাহিনী) সর্বাধিনায়ক। তিনি সামরিক বাহিনীর প্রধানদের নিয়োগ করেন এবং যুদ্ধ বা শান্তি ঘোষণা করার চূড়ান্ত অধিকার তাঁর হাতেই থাকে।

৪. বিচারবিভাগীয় ও ক্ষমা প্রদর্শনের ক্ষমতা:  সংবিধানের ৭২ নম্বর ধারা অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির হাতে ক্ষমা প্রদর্শনের বিশেষ অধিকার রয়েছে। তিনি সামরিক আদালত বা সাধারণ আদালতে দণ্ডিত যেকোনো ব্যক্তির সাজা হ্রাস, স্থগিত বা সম্পূর্ণ ক্ষমা করতে পারেন, বিশেষ করে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামীদের প্রাণভিক্ষা দেওয়ার চূড়ান্ত ক্ষমতা কেবল রাষ্ট্রপতির হাতেই রয়েছে।

৫. জরুরি অবস্থা ঘোষণার ক্ষমতা:  সংকটকালে দেশের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষার্থে রাষ্ট্রপতি তিন ধরনের জরুরি অবস্থা জারি করতে পারেন: যুদ্ধ বা বহিরাক্রমণের কারণে জাতীয় জরুরি অবস্থা (৩৫২ ধারা), রাজ্যে শাসনতান্ত্রিক অচলাবস্থা বা রাষ্ট্রপতির শাসন (৩৫৬ ধারা) এবং আর্থিক ঋণ-মর্যাদা ক্ষুণ্ন হলে আর্থিক জরুরি অবস্থা (৩৬০ ধারা)।

রাষ্ট্রপতির পদমর্যাদার সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ:
৬. নিয়মতান্ত্রিক প্রধান বনাম প্রকৃত শাসক:  রাষ্ট্রপতির এই বিপুল ক্ষমতা দেখে তাঁকে একজন একনায়ক বলে মনে হলেও বাস্তবে তিনি তা নন। সংবিধানের ৭৪(১) নম্বর ধারা অনুযায়ী তাঁকে সাহায্য ও পরামর্শ দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি মন্ত্রীপরিষদ থাকে। ১৯৭৬ সালের ৪২তম এবং ১৯৭৮ সালের ৪৪তম সংবিধান সংশোধনীর পর এটি স্পষ্টভাবে নির্দিষ্ট করা হয়েছে যে, রাষ্ট্রপতি মন্ত্রীপরিষদের লিখিত পরামর্শ মেনে চলতে আইনত বাধ্য। তাই সমালোচকরা তাঁকে 'রবার স্ট্যাম্প' বা 'সোনালি খাঁচায় বন্দি পাখি' বলে কটাক্ষ করেন।

৭. স্বেচ্ছাধীন বা নিজস্ব ক্ষমতা:  রাষ্ট্রপতি নিছক একজন পুতুল নন, বিশেষ পরিস্থিতিতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ নিজস্ব ক্ষমতার প্রয়োগ করেন। সাধারণ নির্বাচনে কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে বা ঝুলন্ত সংসদ (Hung Parliament) তৈরি হলে, কাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমন্ত্রণ জানাবেন, সে বিষয়ে তিনি সম্পূর্ণ নিজস্ব রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ব্যবহার করেন। এছাড়া সংসদে পাস হওয়া কোনো সাধারণ বিল তিনি স্বাক্ষর না করে পুনর্বিবেচনার জন্য মন্ত্রীসভার কাছে ফেরত পাঠাতে পারেন (সাসপেনসিভ ভেটো) অথবা বিলটিতে সম্মতি না জানিয়ে তা অনির্দিষ্টকালের জন্য নিজের কাছে আটকে রাখতে পারেন (পকেট ভেটো)।

৮. অভিভাবক ও ঐক্যের প্রতীক হিসেবে ভূমিকা:  সাম্প্রতিক জোট রাজনীতির যুগে রাষ্ট্রপতির পদমর্যাদা ও গুরুত্ব অনেকাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি কেবল সরকারের নন, সমগ্র জাতির প্রতিনিধি। দলীয় রাজনীতির সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে তিনি দেশের ঐক্য, সংহতি ও সংবিধানের রক্ষাকর্তা হিসেবে কাজ করেন। একজন যোগ্য ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন রাষ্ট্রপতি (যেমন ড. এ. পি. জে. আবদুল কালাম) তাঁর নৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সরকারকে অনেক সময় সঠিক পথ দেখাতে পারেন।

উপসংহার:  ভারতের রাষ্ট্রপতি ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের মতো কেবল একটি আলংকারিক পদ নয়, আবার মার্কিন রাষ্ট্রপতির মতো প্রকৃত শাসকও নন। ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্রে রাষ্ট্রপতি হলেন এমন একজন সাংবিধানিক প্রধান, যিনি সংকটের সময় দেশের স্থিতিশীলতা বজায় রাখেন এবং স্বাভাবিক সময়ে একজন নিরপেক্ষ অভিভাবকের মতো সরকারের কাজকর্মকে সাংবিধানিক গণ্ডির মধ্যে পরিচালিত করেন।



১৬। ভারতে একটি হাইকোর্ট (মহাধর্মাধিকরণ)-এর গঠন, ক্ষমতা ও কার্যাবলী আলোচনা করো।


ভূমিকা:   ভারতের অখণ্ড ও ক্রমোচ্চ বিচারব্যবস্থায় সুপ্রিম কোর্টের ঠিক পরেই অঙ্গরাজ্য স্তরে সর্বোচ্চ বিচারালয় হলো হাইকোর্ট বা মহাধর্মাধিকরণ। সংবিধানে আইনের শাসন এবং নাগরিকদের মৌলিক অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে হাইকোর্টকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা প্রদান করা হয়েছে। সংবিধানের ২১৪ নম্বর ধারা অনুযায়ী প্রতিটি রাজ্যের জন্য একটি করে হাইকোর্ট থাকার কথা বলা হয়েছে। তবে সংসদের ক্ষমতাবলে দুই বা ততোধিক রাজ্যের জন্য একটি সাধারণ হাইকোর্টও থাকতে পারে (যেমন, পশ্চিমবঙ্গ ও আন্দামান নিকোবরের জন্য কলকাতা হাইকোর্ট)। 

হাইকোর্টের গঠন ও বিচারপতিদের যোগ্যতা:
গঠন প্রক্রিয়া ও নিয়োগ:  একটি হাইকোর্ট একজন প্রধান বিচারপতি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির দ্বারা স্থির করা অন্যান্য কয়েকজন বিচারপতিকে নিয়ে গঠিত হয়। রাষ্ট্রপতি ভারতের প্রধান বিচারপতি এবং সংশ্লিষ্ট রাজ্যের রাজ্যপালের সাথে পরামর্শ করে হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতিকে নিয়োগ করেন। অন্যান্য বিচারপতিদের নিয়োগের সময় হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির মতামতও গ্রহণ করা হয়। বর্তমানে কলিজিয়াম (Collegium) ব্যবস্থার মাধ্যমে এই নিয়োগ সম্পন্ন হয়।

বিচারপতিদের যোগ্যতা:  হাইকোর্টের বিচারপতি হওয়ার জন্য প্রথমত প্রার্থীকে অবশ্যই ভারতের নাগরিক হতে হবে। দ্বিতীয়ত, তাঁকে ভারতের সীমানার মধ্যে বিচারবিভাগীয় কোনো পদে কমপক্ষে ১০ বছর কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে, অথবা কোনো হাইকোর্টে অন্তত ১০ বছর আইনজীবী (অ্যাডভোকেট) হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। তাঁরা ৬২ বছর বয়স পর্যন্ত স্বপদে বহাল থাকেন।

হাইকোর্টের ক্ষমতা ও কার্যাবলী:
a. মূল এলাকা বা প্রারম্ভিক এক্তিয়ার (Original Jurisdiction):    কিছু নির্দিষ্ট মামলা আছে যেগুলি নিম্ন আদালতে না গিয়ে সরাসরি হাইকোর্টে দায়ের করা যায়, একে মূল এলাকা বলা হয়। বিবাহ সংক্রান্ত আইন, কোম্পানি আইন, এবং আদালত অবমাননা সংক্রান্ত মামলা এর অন্তর্ভুক্ত। তবে এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ২২৬ নম্বর ধারা। এই ধারা অনুযায়ী, নাগরিকদের মৌলিক অধিকার বা অন্য যেকোনো আইনি অধিকার রক্ষার জন্য হাইকোর্ট বন্দীপ্রত্যক্ষীকরণ, পরমাদেশ, প্রতিষেধ, অধিকার পৃচ্ছা এবং উৎপেষণ নামক পাঁচটি বিশেষ লেখ বা নির্দেশ (Writ) জারি করতে পারে। এই ক্ষেত্রে হাইকোর্টের ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের (৩২ ধারা) চেয়েও বেশি বিস্তৃত।

b. আপিল এলাকা (Appellate Jurisdiction):   রাজ্যের সর্বোচ্চ আপিল আদালত হিসেবে হাইকোর্ট নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল শুনতে পারে। দেওয়ানি মামলার ক্ষেত্রে জেলা জজ আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করা যায়। ফৌজদারি মামলার ক্ষেত্রে, কোনো দায়রা আদালত (Sessions Court) যদি কোনো অভিযুক্তকে ৭ বছরের বেশি কারাদণ্ড দেয় বা মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে, তবে সেই রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করা যায়। নিম্ন আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ড হাইকোর্টের অনুমোদন ছাড়া কার্যকর করা যায় না।

c. তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা (Supervisory Jurisdiction):  সংবিধানের ২২৭ নম্বর ধারা অনুযায়ী, হাইকোর্ট তার নিজস্ব ভৌগোলিক এক্তিয়ারভুক্ত এলাকার সমস্ত নিম্ন আদালত এবং ট্রাইব্যুনালগুলির (সামরিক ট্রাইব্যুনাল বাদে) ওপর সাধারণ তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে। নিম্ন আদালতগুলি কীভাবে কাজ করবে, তাদের হিসাবপত্র কীভাবে রাখা হবে, তার নিয়মকানুন হাইকোর্টই তৈরি করে দেয়।

d. মামলা স্থানান্তরের ক্ষমতা:   সংবিধানের ২২৮ নম্বর ধারা অনুযায়ী, কোনো নিম্ন আদালতে বিচারাধীন কোনো মামলায় যদি হাইকোর্ট মনে করে যে তাতে সংবিধান ব্যাখ্যার কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন জড়িয়ে আছে, তবে হাইকোর্ট সেই মামলাটি নিম্ন আদালত থেকে নিজের কাছে সরিয়ে নিতে পারে এবং নিজেই তার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করতে পারে।৭. অভিলেখ আদালত হিসেবে ভূমিকা (Court of Record):সংবিধানের ২১৫ নম্বর ধারা অনুযায়ী হাইকোর্ট একটি অভিলেখ আদালত বা 'কোর্ট অফ রেকর্ড' হিসেবে কাজ করে। এর অর্থ হলো, হাইকোর্টের সমস্ত রায় ও কার্যবিবরণী ভবিষ্যতের জন্য নথিবদ্ধ থাকে এবং অধস্তন আদালতগুলি তা দৃষ্টান্ত বা আইনি নজির হিসেবে ব্যবহার করে। এছাড়া, নিজের নির্দেশ অমান্য করা বা আদালত অবমাননার জন্য হাইকোর্ট যেকোনো ব্যক্তিকে শাস্তি প্রদান করতে পারে।

e. বিচারবিভাগীয় পর্যালোচনা ও নাগরিকদের অধিকার রক্ষা:   রাজ্য আইনসভা প্রণীত কোনো আইন বা রাজ্য সরকারের কোনো নির্দেশ যদি সংবিধানের পরিপন্থী হয়, তবে হাইকোর্ট তার বিচারবিভাগীয় পর্যালোচনা (Judicial Review) ক্ষমতার মাধ্যমে তাকে অসাংবিধানিক বলে বাতিল ঘোষণা করতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে জনস্বার্থ মামলার (PIL) মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষা এবং প্রশাসনিক দুর্নীতি রোধে হাইকোর্টগুলি অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।

উপসংহার:  পরিশেষে বলা যায়, রাজ্যের বিচারব্যবস্থাকে শৃঙ্খলার মধ্যে রাখা এবং তাকে নিরপেক্ষভাবে পরিচালনা করার ক্ষেত্রে হাইকোর্টের ক্ষমতা অত্যন্ত ব্যাপক। নাগরিকদের অধিকার রক্ষা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে সাংবিধানিক ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে মহাধর্মাধিকরণ রাজ্যের এক অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে কাজ করে চলেছে।


ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য কিছু প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQs)

১. বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (VU) MDC 1-T ভারতীয় সংবিধান (Indian Constitution) পেপারের বিগত বছরের প্রশ্ন (PYQs) সলভ করা কেন জরুরি?

উত্তর: বিগত ৩-৫ বছরের প্রশ্নপত্র সমাধান করলে পরীক্ষার প্রশ্নের ধরন এবং কোন টপিকগুলো থেকে বারবার প্রশ্ন আসে, সে সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়। বিশেষ করে নতুন CCFUP (NEP 2020) কারিকুলামে কোন অধ্যায়গুলো বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তা বুঝতে PYQs-এর কোনো বিকল্প নেই।

উত্তর: সাধারণত বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী, ২ নম্বরের প্রশ্নের (বিভাগ ক) উত্তর ২-৩টি বাক্যে (সর্বোচ্চ ৪০-৫০ শব্দ), ৫ নম্বরের প্রশ্নের (বিভাগ খ) উত্তর ১৫০-২০০ শব্দের মধ্যে এবং ১০ নম্বরের প্রশ্নের (বিভাগ গ) উত্তর ৩০০-৪০০ শব্দের মধ্যে লেখা উচিত। তবে শব্দের চেয়ে উত্তরের গুণমান এবং সঠিক পয়েন্টের ওপর বেশি জোর দেওয়া প্রয়োজন।

উত্তর: বাধ্যতামূলক নয়, তবে ৫ এবং ১০ নম্বরের ব্রড প্রশ্নের ক্ষেত্রে প্যারাগ্রাফ করে লেখার চেয়ে পয়েন্ট (Points) ও সাব-পয়েন্ট (Sub-points) দিয়ে লিখলে নম্বর অনেক ভালো ওঠে। উত্তরের শুরুতে একটি প্রাসঙ্গিক ভূমিকা (Introduction) এবং শেষে একটি উপসংহার (Conclusion) দিলে খাতার মান বৃদ্ধি পায়।

উত্তর: হ্যাঁ, আপনি আপনার সুবিধামতো বাংলা অথবা ইংরেজি—যেকোনো একটি ভাষায় সম্পূর্ণ পেপারের উত্তর লিখতে পারেন। তবে একই পেপারে কিছু উত্তর বাংলায় এবং কিছু উত্তর ইংরেজিতে লেখা উচিত নয় (Technical terms ছাড়া)।

উত্তর: বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের MDC 1-T ভারতীয় সংবিধান (Indian Constitution) পেপারের সম্পূর্ণ আপডেটেড সিলেবাস এবং সেমিস্টার অনুযায়ী স্টাডি মেটেরিয়ালস ও নোটস পেতে আমাদের ওয়েবসাইটের 'সিলেবাস' এবং 'নোটস' সেকশনে ভিজিট করতে পারো। এছাড়াও টপিক-ভিত্তিক ভিডিও আলোচনার জন্য Polity Politics ইউটিউব চ্যানেলটি দেখতে পারো।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন:

Facebook WhatsApp Telegram
Scroll to Top