বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয় ভারতীয় সংবিধান (MDC 01) বিগত বছরের প্রশ্নোত্তর | Vidyasagar University - VU Indian Constitution PYQ & Notes in Bengali
Vidyasagar University-এর UG 1st Semester (CCFUP-NEP)-এর ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য এই পোস্টে Indian Constitution MDC 01 সিলেবাসের Previous Years’ Questions (PYQs) & Answers বাংলা ভাষায় (Bangla Notes) আলোচনা করা হলো।
স্নাতক প্রথম সেমিস্টার (Indian Constitution MDC 01) ভারতীয় সংবিধান — বিগত বছরের প্রশ্ন ও উত্তর
Vidyasagar University UG 1st Semester Examination (NEP-CCFUP) 2024
Subject: Indian Constitution
Paper: MDC 1-T
Time: 2 Hours Full Marks:40
বিভাগ ক * Group A * প্রতিটি প্রশ্নের মান ২ (যে-কোনো পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে)
১। গণপরিষদ কখন এবং কেন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল?
(When and why was the Constituent Assembly established?)
উত্তর: ১৯৪৬ সালের ১৬ই মে ক্যাবিনেট মিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী স্বাধীন ভারতের জন্য একটি নিজস্ব সংবিধান রচনার উদ্দেশ্যে গণপরিষদ বা সংবিধান সভা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এর প্রধান কাজ ছিল পরাধীন ভারতের অবসান ঘটিয়ে একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য সুনির্দিষ্ট শাসনতান্ত্রিক রূপরেখা বা লিখিত আইনকানুন তৈরি করা। এই সভার সদস্যরাই দীর্ঘ আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ভারতের বর্তমান সংবিধানটি চূড়ান্ত করেছিলেন।
২। ভারতীয় সংবিধানে কয়টি মৌলিক অধিকারের উল্লেখ রয়েছে?
(How many fundamental rights are mentioned in the Indian Constitution?)
উত্তর: ভারতের মূল সংবিধানে প্রাথমিকভাবে সাতটি মৌলিক অধিকারের উল্লেখ থাকলেও বর্তমানে মোট ছয়টি মৌলিক অধিকার রয়েছে। ১৯৭৮ সালে ৪৪তম সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে সম্পত্তির অধিকারকে মৌলিক অধিকারের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে থাকা অধিকারগুলি হলো সাম্যের অধিকার, স্বাধীনতার অধিকার, শোষণের বিরুদ্ধে অধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার, সংস্কৃতি ও শিক্ষাবিষয়ক অধিকার এবং শাসনতান্ত্রিক প্রতিবিধানের অধিকার।
৩। ভারতীয় সংবিধানের কোন্ কোন্ ধারায় রাষ্ট্র পরিচালনার নির্দেশমূলক নীতিগুলির উল্লেখ রয়েছে?
(In which articles of the Indian Constitution are the Directive Principles of State Policy mentioned?)
উত্তর: ভারতীয় সংবিধানের চতুর্থ অংশে (Part IV) ৩৬ নম্বর ধারা থেকে ৫১ নম্বর ধারার মধ্যে রাষ্ট্র পরিচালনার নির্দেশমূলক নীতিগুলির সুস্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। এই নীতিগুলি আয়ারল্যান্ডের সংবিধান থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে গ্রহণ করা হয়েছে। দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন এবং একটি প্রকৃত কল্যাণকামী বা ওয়েলফেয়ার রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই এই নীতিগুলি সংবিধানে যুক্ত করা হয়েছে।
৪। ভারতে কতগুলি মৌলিক কর্তব্য রয়েছে?
(How many fundamental duties are there in India?)
উত্তর: বর্তমানে ভারতের সংবিধানে নাগরিকদের জন্য মোট ১১টি মৌলিক কর্তব্যের উল্লেখ রয়েছে। ১৯৭৬ সালে ৪২তম সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে প্রথমবার ১০টি মৌলিক কর্তব্য যুক্ত করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০০২ সালে ৮৬তম সংশোধনীর মাধ্যমে শিশুদের শিক্ষার সুযোগ প্রদান সংক্রান্ত আরও একটি কর্তব্য যুক্ত হওয়ায় এর সংখ্যা ১১ তে গিয়ে দাঁড়ায়।
৫। ভারতের রাষ্ট্রপতি কীভাবে নির্বাচিত হন?
(How is the President of India elected?)
উত্তর: ভারতের রাষ্ট্রপতি সরাসরি জনগণের দ্বারা নির্বাচিত হন না, তিনি একটি বিশেষ নির্বাচক মণ্ডলী বা ইলেক্টোরাল কলেজের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে নির্বাচিত হন। এই নির্বাচক মণ্ডলী গঠিত হয় সংসদের উভয় কক্ষের (লোকসভা ও রাজ্যসভা) নির্বাচিত সদস্যদের এবং সমস্ত রাজ্যের বিধানসভার নির্বাচিত সদস্যদের নিয়ে। এই নির্বাচন পদ্ধতিটি সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে একক হস্তান্তরযোগ্য ভোটের মাধ্যমে অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে সম্পন্ন হয়।
৬। ভারতীয় সংসদের (পার্লামেন্টের) দু'টি কক্ষের নাম লেখো।
(Name the two houses of the Indian Parliament.)
উত্তর: ভারতীয় সংসদ দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট এবং এর কক্ষ দুটির নাম হলো রাজ্যসভা ও লোকসভা। রাজ্যসভা হলো সংসদের উচ্চকক্ষ, যা মূলত রাজ্যগুলির প্রতিনিধিত্ব করে এবং এটি একটি স্থায়ী কক্ষ। অন্যদিকে লোকসভা হলো সংসদের নিম্নকক্ষ, যা সরাসরি প্রাপ্তবয়স্ক জনগণের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা গঠিত হয়।
৭। রাজ্যসভার সভাপতি কে?
(Who is the Chairman of the Rajya Sabha?)
উত্তর: ভারতের উপরাষ্ট্রপতি পদাধিকার বলে রাজ্যসভার সভাপতি বা চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে ভারতের উপরাষ্ট্রপতিই হলেন রাজ্যসভার প্রধান পরিচালক যিনি সভার যাবতীয় কাজকর্ম এবং শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করেন। তিনি রাজ্যসভার সদস্য না হলেও সভার বিতর্কে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করেন এবং ভোটদানে অচলাবস্থা সৃষ্টি হলে কাস্টিং ভোট দিতে পারেন।
৮। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে কে নিযুক্ত করেন?
(Who appoints the Chief Justice of the Supreme Court?)
উত্তর: সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে ভারতের রাষ্ট্রপতি আনুষ্ঠানিকভাবে নিযুক্ত করেন। সাধারণত সুপ্রিম কোর্টের কর্মরত বিচারপতিদের মধ্যে যিনি সবচেয়ে প্রবীণ বা বয়োজ্যেষ্ঠ, প্রথা অনুযায়ী তাঁকেই রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ করে থাকেন। এই নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি প্রয়োজনে অন্যান্য প্রবীণ বিচারপতিদের সাথেও আলোচনা করতে পারেন।
বিভাগ খ * Group B * প্রতিটি প্রশ্নের মান ৫ (যে-কোনো দুইটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে)
৯। মৌলিক অধিকার ও নির্দেশাত্মক নীতির মধ্যে পার্থক্যগুলি উল্লেখ করো।
(Mention the differences between Fundamental Rights and Directive Principles.)
উত্তর: মৌলিক অধিকার এবং রাষ্ট্র পরিচালনার নির্দেশমূলক নীতি উভয়েই ভারতীয় সংবিধানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি দিক হলেও এদের মধ্যে কিছু মৌলিক ও সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে।
প্রথমত, আইনগত বৈধতার দিক থেকে মৌলিক অধিকারগুলি হলো আদালত দ্বারা বলবৎযোগ্য। অর্থাৎ, কোনো নাগরিকের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন হলে তিনি সরাসরি সুপ্রিম কোর্ট বা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হতে পারেন। কিন্তু নির্দেশমূলক নীতিগুলি আদালত দ্বারা বলবৎযোগ্য নয়। রাষ্ট্র এই নীতিগুলি পালন না করলে আদালতের কাছে কোনো আইনি প্রতিকার দাবি করা যায় না।
দ্বিতীয়ত, লক্ষ্যের দিক থেকে বিচার করলে দেখা যায়, মৌলিক অধিকারের মূল উদ্দেশ্য হলো দেশে একটি রাজনৈতিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা এবং রাষ্ট্রের স্বৈরাচারী ক্ষমতার উপর নিয়ন্ত্রণ টানা। অন্যদিকে, নির্দেশমূলক নীতিগুলির প্রধান লক্ষ্য হলো দেশে একটি প্রকৃত আর্থ-সামাজিক গণতন্ত্র এবং জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র বা ওয়েলফেয়ার স্টেট প্রতিষ্ঠা করা।
তৃতীয়ত, মৌলিক অধিকারগুলি মূলত নেতিবাচক প্রকৃতির, কারণ এগুলি রাষ্ট্রকে কিছু নির্দিষ্ট কাজ করা থেকে বিরত থাকতে বাধ্য করে যাতে নাগরিকদের স্বাধীনতা খর্ব না হয়। কিন্তু নির্দেশমূলক নীতিগুলি হলো ইতিবাচক নির্দেশিকা, কারণ এগুলি রাষ্ট্রকে নাগরিকদের কল্যাণে কিছু নির্দিষ্ট জনহিতকর কাজ করার নির্দেশ দেয়।
চতুর্থত, মৌলিক অধিকারের ধারণাটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান থেকে গ্রহণ করা হয়েছে এবং এটি সংবিধানের তৃতীয় অংশে আলোচিত হয়েছে। অপরপক্ষে, নির্দেশমূলক নীতির ধারণাটি আয়ারল্যান্ডের সংবিধান থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ভারতীয় সংবিধানের চতুর্থ অংশে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।
পঞ্চমত, জাতীয় জরুরি অবস্থা চলাকালীন ২০ এবং ২১ নম্বর ধারা ব্যতীত অন্যান্য মৌলিক অধিকারগুলি সাময়িকভাবে বাতিল বা স্থগিত করা যেতে পারে। কিন্তু নির্দেশমূলক নীতিগুলিকে কখনোই স্থগিত বা বাতিল করা যায় না, কারণ এগুলি সর্বদা শাসনতান্ত্রিক আদর্শ হিসেবে কাজ করে।
১০। নাগরিকদের শাসনতান্ত্রিক প্রতিবিধানের অধিকার সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত টীকা লেখো।
(Write a short note on the citizens' right to constitutional remedies.)
উত্তর: ভারতীয় সংবিধানের তৃতীয় অংশে ৩২ নম্বর ধারায় নাগরিকদের শাসনতান্ত্রিক প্রতিবিধানের অধিকার বা রাইট টু কনস্টিটিউশনাল রেমেডিজ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। সংবিধানে নাগরিকদের জন্য যেসব মৌলিক অধিকারের কথা বলা হয়েছে, সেগুলিকে বাস্তবে সুরক্ষিত ও কার্যকর করার ক্ষেত্রে এই অধিকারটির গুরুত্ব অপরিসীম। ডঃ বি আর আম্বেদকর এই অধিকারটিকে সংবিধানের প্রাণ এবং আত্মা বলে অভিহিত করেছেন, কারণ এই অধিকারটি ছাড়া বাকি সমস্ত মৌলিক অধিকারই সাধারণ মানুষের কাছে একেবারের মূল্যহীন হয়ে পড়ত। এই অধিকারের মূল কথা হলো, যদি কোনো কারণে রাষ্ট্র বা অন্য কোনো ব্যক্তি দ্বারা কোনো নাগরিকের মৌলিক অধিকার খর্ব হয়, তবে তিনি সরাসরি সর্বোচ্চ আদালত অর্থাৎ সুপ্রিম কোর্ট বা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হতে পারবেন। নাগরিকদের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য সুপ্রিম কোর্ট ৩২ নম্বর ধারা অনুযায়ী এবং হাইকোর্ট ২২৬ নম্বর ধারা অনুযায়ী পাঁচ ধরনের বিশেষ নির্দেশ বা লেখ (Writ) জারি করতে পারে। এই পাঁচটি লেখ হলো:
১) বন্দী প্রত্যক্ষীকরণ: বেআইনিভাবে আটক কোনো ব্যক্তিকে অবিলম্বে সশরীরে আদালতের সামনে হাজির করার নির্দেশ।
২) পরমাদেশ: আদালত যখন কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠানকে তার নির্দিষ্ট আইনি দায়িত্ব পালনের জন্য নির্দেশ দেয়।
৩) প্রতিষেধ: নিম্ন আদালত বা ট্রাইব্যুনাল যখন নিজের আইনি অধিকারের বাইরে গিয়ে কাজ করে, তখন উচ্চ আদালত তাকে বাধা দেওয়ার জন্য এই লেখ জারি করে।
৪) অধিকার পৃচ্ছা: কোনো ব্যক্তি যদি অবৈধভাবে কোনো সরকারি পদ দখল করে বসেন, তবে আদালত তার কাছে জানতে চায় কোন অধিকারে তিনি ওই পদে আছেন।
৫) উৎপ্রেষণ: নিম্ন আদালতের কোনো বিচারাধীন মামলা উচ্চ আদালত নিজের হাতে তুলে নেওয়ার জন্য বা নিম্ন আদালতের ভুল রায় বাতিল করার জন্য এটি জারি করে।
১১। লোকসভার গঠন ও ক্ষমতা সম্পর্কে লেখো।
(Write about the composition and powers of the Lok Sabha.)
উত্তর: ভারতীয় সংসদের নিম্নকক্ষ বা জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত কক্ষটির নাম হলো লোকসভা। লোকসভার গঠন ও কার্যাবলী ভারতীয় গণতান্ত্রিক কাঠামোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
লোকসভার গঠন: সংবিধান অনুযায়ী লোকসভার সর্বোচ্চ সদস্য সংখ্যা হতে পারে ৫৫২ জন। বর্তমানে এর সদস্য সংখ্যা হলো ৫৪৩ জন, যাঁরা সরাসরি প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের ভিত্তিতে বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকা থেকে জনগণের দ্বারা নির্বাচিত হয়ে আসেন। লোকসভার সদস্য হতে গেলে প্রার্থীর বয়স কমপক্ষে ২৫ বছর হতে হয়। সাধারণত লোকসভার মেয়াদ ৫ বছর, তবে জরুরি অবস্থায় এই মেয়াদ বাড়ানো যেতে পারে অথবা মেয়াদ শেষের আগেই রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে লোকসভা ভেঙে দিতে পারেন। সভার কাজ পরিচালনার জন্য সদস্যরা নিজেদের মধ্য থেকে একজনকে স্পিকার বা অধ্যক্ষ হিসেবে নির্বাচিত করেন।
লোকসভার ক্ষমতা: সংসদীয় ব্যবস্থায় রাজ্যসভার তুলনায় লোকসভা অনেক বেশি শক্তিশালী। এর প্রধান ক্ষমতাগুলিকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়।
১) আইন প্রণয়ন ক্ষমতা: কেন্দ্র তালিকা ও যুগ্ম তালিকাভুক্ত যেকোনো বিষয়ে লোকসভা আইন তৈরি করতে পারে। সাধারণ বিল সংসদের যেকোনো কক্ষে উত্থাপন করা গেলেও, বাস্তবে বেশিরভাগ বিল লোকসভাতেই প্রথম পেশ করা হয়।
২) আর্থিক ক্ষমতা: আর্থিক দিক থেকে লোকসভার ক্ষমতা চূড়ান্ত। সংবিধানের ১০৯ নম্বর ধারা অনুযায়ী অর্থ বিল শুধুমাত্র লোকসভাতেই উত্থাপন করা যায়, রাজ্যসভায় নয়। লোকসভা বাজেট বা অর্থ বিল অনুমোদন না করলে সরকারের পতন ঘটে।
৩) শাসনবিভাগীয় নিয়ন্ত্রণ: লোকসভা হলো মন্ত্রীপরিষদের প্রধান নিয়ন্ত্রক। সংবিধান অনুযায়ী সমগ্র মন্ত্রীপরিষদ তাদের কাজের জন্য যৌথভাবে লোকসভার কাছে দায়ী থাকে। লোকসভায় অনাস্থা প্রস্তাব পাস হলে প্রধানমন্ত্রীসহ সমগ্র ক্যাবিনেটকে পদত্যাগ করতে হয়।
৪) অন্যান্য ক্ষমতা: লোকসভা রাষ্ট্রপতির নির্বাচন ও অপসারণ (ইমপিচমেন্ট), উপরাষ্ট্রপতি নির্বাচন, বিচারপতিদের অপসারণ এবং সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।
১২। বিচার বিভাগীয় পর্যবেক্ষণ কী?
(What is Judicial Review?)
উত্তর: বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনা বা জুডিশিয়াল রিভিউ হলো সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টের হাতে থাকা এমন একটি বিশেষ ক্ষমতা, যার মাধ্যমে আদালত আইনসভা প্রণীত কোনো আইন বা শাসনবিভাগ কর্তৃক জারি করা কোনো নির্দেশিকা সংবিধান সম্মত কি না, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করে দেখতে পারে। যদি দেখা যায় যে কোনো নতুন আইন বা সরকারি আদেশ সংবিধানের মূল কাঠামোর বিরোধী বা নাগরিকদের মৌলিক অধিকার খর্ব করছে, তবে আদালত সেই আইনটিকে অসাংবিধানিক বা অবৈধ বলে বাতিল করে দিতে পারে। এই ধারণাটির উৎপত্তি হয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, তবে ভারতীয় সংবিধানেও এই ক্ষমতা অত্যন্ত সুকৌশলে গ্রহণ করা হয়েছে। ভারতীয় সংবিধানে সরাসরি বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনা কথাটি উল্লেখ না থাকলেও ১৩, ৩২ এবং ২২৬ নম্বর ধারার মাধ্যমে আদালতকে এই অসীম ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার প্রধান উদ্দেশ্যগুলি হলো:
১) সংবিধানের প্রাধান্য রক্ষা করা: যেহেতু ভারতে সংবিধানই হলো সর্বোচ্চ আইন, তাই কোনো সরকার বা প্রতিষ্ঠান যেন সংবিধান লঙ্ঘন করে কাজ করতে না পারে, তা সুনিশ্চিত করা আদালতের দায়িত্ব।
২) মৌলিক অধিকারের সুরক্ষা: নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের ওপর যাতে রাষ্ট্র কোনো অন্যায় হস্তক্ষেপ করতে না পারে, তার জন্য আদালত এই ক্ষমতা প্রয়োগ করে।
৩) যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভারসাম্য বজায় রাখা: কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারগুলি যেন একে অপরের নির্দিষ্ট আইনি ক্ষমতার সীমানা লঙ্ঘন না করে, তা দেখভাল করা বিচার বিভাগের অন্যতম কাজ।
১৯৭৩ সালের বিখ্যাত কেশবানন্দ ভারতী মামলায় সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্টভাবে রায় দিয়েছিল যে, সংসদ সংবিধান সংশোধন করতে পারলেও সংবিধানের মূল কাঠামো কোনোভাবেই পরিবর্তন করতে পারবে না। এই রায় বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার একটি যুগান্তকারী উদাহরণ।
সংক্ষেপে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং আইনের শাসন টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে এটি হলো আদালতের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার।
বিভাগ গ * Group C * প্রতিটি প্রশ্নের মান ১০ (যে-কোনো দুইটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে)
১৩। ভারতীয় নাগরিকদের সাম্যের অধিকার সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করো।
(Discuss briefly the right to equality of Indian citizens.)
ভূমিকা:
গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো সাম্য বা সমতা। ভারতীয় সংবিধান প্রণেতারা দেশের প্রতিটি মানুষের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বৈষম্য দূর করার লক্ষ্যে সংবিধানে সাম্যের অধিকারকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। ভারতীয় সংবিধানের তৃতীয় অংশে (Part III) ১৪ থেকে ১৮ নম্বর ধারার মধ্যে নাগরিকদের 'সাম্যের অধিকার' (Right to Equality) বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে। এটি ভারতীয় নাগরিকদের অন্যতম প্রধান মৌলিক অধিকার।
১৪ নম্বর ধারা: আইনের দৃষ্টিতে সমতা এবং আইনের সমান সংরক্ষণ:সংবিধানের ১৪ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে যে, ভারতের সীমানার মধ্যে রাষ্ট্র কোনো ব্যক্তিকে 'আইনের দৃষ্টিতে সমতা' (Equality before law) অথবা 'আইনের সমান সংরক্ষণ' (Equal protection of laws) থেকে বঞ্চিত করতে পারবে না।
আইনের দৃষ্টিতে সমতা: এটি একটি ব্রিটিশ ধারণা, যার অর্থ হলো দেশের আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। ধনী-দরিদ্র, উচ্চ-নিচ পদাধিকারী নির্বিশেষে সকলেই সাধারণ আইনের অধীন এবং সাধারণ আদালতের এক্তিয়ারভুক্ত।
আইনের সমান সংরক্ষণ: এটি মার্কিন সংবিধান থেকে গৃহীত একটি ইতিবাচক ধারণা। এর অর্থ হলো, সম-অবস্থায় থাকা ব্যক্তিদের প্রতি আইন সমান আচরণ করবে। অর্থাৎ, পরিস্থিতি এক হলে আইনের প্রয়োগও সকলের জন্য এক হবে।
১৫ নম্বর ধারা: বৈষম্যমূলক আচরণের নিবারণ:এই ধারায় বলা হয়েছে যে, রাষ্ট্র কেবল ধর্ম, জাতি, বর্ণ, লিঙ্গ বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিকের প্রতি কোনো প্রকার বৈষম্যমূলক আচরণ করতে পারবে না। দোকান, সাধারণ ভোজনালয়, হোটেল, বিনোদন স্থান, কিংবা সরকারি অর্থে বা আংশিক সাহায্যে পরিচালিত কুয়ো, পুকুর, স্নানের ঘাট, রাস্তা বা সাধারণের ব্যবহারের জায়গাগুলিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে কোনো নাগরিককে বাধা দেওয়া যাবে না। তবে, এই ধারার কিছু ব্যতিক্রম রয়েছে। নারী ও শিশুদের কল্যাণের জন্য রাষ্ট্র বিশেষ আইন করতে পারে। এছাড়া, সামাজিক ও শিক্ষাগত দিক থেকে অনগ্রসর শ্রেণি (OBC) এবং তপশিলি জাতি ও উপজাতিদের (SC/ST) উন্নতির জন্য রাষ্ট্র বিশেষ সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে পারে।
১৬ নম্বর ধারা: সরকারি চাকরিতে সমান সুযোগ:১৬ নম্বর ধারা অনুযায়ী, রাষ্ট্রের অধীনে কোনো সরকারি চাকরি বা পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের সমান সুযোগ থাকবে। কেবল ধর্ম, জাতি, বর্ণ, লিঙ্গ, জন্মস্থান বা বাসস্থানের কারণে কোনো নাগরিক সরকারি চাকরির অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন না।
এর ব্যতিক্রম হিসেবে বলা হয়েছে যে, রাষ্ট্র যদি মনে করে সরকারি চাকরিতে কোনো অনগ্রসর শ্রেণির (Backward Classes) পর্যাপ্ত প্রতিনিধিত্ব নেই, তবে তাদের জন্য পদ সংরক্ষণের (Reservation) ব্যবস্থা করতে পারে। মণ্ডল কমিশনের সুপারিশ এবং পরবর্তী সুপ্রিম কোর্টের রায় অনুযায়ী এই সংরক্ষণ নীতি বর্তমানে কার্যকর রয়েছে।
১৭ নম্বর ধারা: অস্পৃশ্যতা দূরীকরণ:ভারতীয় সমাজব্যবস্থার অন্যতম কলঙ্ক ছিল অস্পৃশ্যতা বা ছোঁয়াছুঁয়ি প্রথা। সংবিধানের ১৭ নম্বর ধারার মাধ্যমে এই অস্পৃশ্যতাকে সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কোনো আকারেই অস্পৃশ্যতার আচরণ বরদাস্ত করা হবে না। এই অধিকারকে কার্যকর করার জন্য ভারত সরকার ১৯৫৫ সালে 'অস্পৃশ্যতা অপরাধ আইন' পাশ করে, যা পরে ১৯৭৬ সালে 'নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ আইন' (Protection of Civil Rights Act) নামে সংশোধিত হয়। এই আইন অনুযায়ী অস্পৃশ্যতা একটি শাস্তিযোগ্য ও ফৌজদারি অপরাধ।
১৮ নম্বর ধারা: খেতাব বা উপাধি বিলোপ:গণতান্ত্রিক সমাজে কৃত্রিম বৈষম্য দূর করার জন্য ১৮ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে যে, রাষ্ট্র কোনো ব্যক্তিকে কোনো খেতাব বা উপাধি (Titles) প্রদান করতে পারবে না। ব্রিটিশ আমলে দেওয়া 'রায়বাহাদুর', 'নাইট' বা 'স্যার' ইত্যাদি উপাধিগুলি বাতিল করা হয়েছে। তবে এর ব্যতিক্রম হিসেবে সামরিক ও শিক্ষাগত কৃতিত্বের জন্য উপাধি (যেমন- মেজর, ক্যাপ্টেন, ডক্টর, প্রফেসর) দেওয়া যাবে। এছাড়া ভারতরত্ন, পদ্মবিভূষণ, পদ্মশ্রী প্রভৃতি জাতীয় সম্মানগুলিকে সুপ্রিম কোর্ট উপাধি হিসেবে গণ্য না করে জাতীয় পুরস্কার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
মূল্যায়ন ও উপসংহার: সংবিধানে বর্ণিত সাম্যের অধিকার কোনো চরম বা অবাধ অধিকার নয়। সামাজিক ন্যায়বিচার ও অনগ্রসর মানুষের উন্নয়নের স্বার্থে রাষ্ট্র যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে পারে। এই অধিকারগুলি কেবল কাগুজে প্রতিশ্রুতি নয়, বরং স্বাধীন ভারতে একটি ধর্মনিরপেক্ষ, বৈষম্যহীন এবং গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনের অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ার।
১৪। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মূল্যায়ন করো।
(Evaluate the powers of the Prime Minister of India.)
ভূমিকা: ভারতের সংসদীয় গণতান্ত্রিক शासनব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী হলেন দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং শক্তিশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। সংবিধানে রাষ্ট্রপতিকে দেশের শাসনতান্ত্রিক প্রধান হিসেবে বর্ণনা করা হলেও বাস্তবে তিনি হলেন নামসর্বস্ব প্রধান। দেশের প্রকৃত শাসনক্ষমতা পরিচালিত হয় প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর নেতৃত্বাধীন ক্যাবিনেটের দ্বারা। ব্রিটিশ সংসদীয় ব্যবস্থার অনুকরণে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর পদটি তৈরি করা হয়েছে। লর্ড মর্লের ভাষায়, প্রধানমন্ত্রী হলেন "সমকক্ষদের মধ্যে প্রথম" (Primus inter pares), তবে বর্তমানে তাঁর ক্ষমতা এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছে যে তাঁকে "ক্যাবিনেট রূপী তোরণের মূলভিত্তি" বলা হয়।
প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা ও কার্যাবলী: প্রধানমন্ত্রীর বিশাল ও বহুমুখী ক্ষমতাকে কয়েকটি প্রধান ভাগে আলোচনা করা যায়:
১. ক্যাবিনেট বা মন্ত্রীপরিষদ গঠন ও পরিচালনা: প্রধানমন্ত্রীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো সরকার বা ক্যাবিনেট গঠন করা।মন্ত্রীদের নিয়োগ: প্রধানমন্ত্রী তাঁর দলের যোগ্য সদস্যদের একটি তালিকা তৈরি করে রাষ্ট্রপতির কাছে পেশ করেন এবং রাষ্ট্রপতি কেবল সেই তালিকা অনুযায়ীই মন্ত্রীদের নিয়োগ করেন।দপ্তর বণ্টন ও পরিবর্তন: মন্ত্রীদের মধ্যে কে কোন দপ্তরের (যেমন- স্বরাষ্ট্র, অর্থ, প্রতিরক্ষা) দায়িত্ব পাবেন, তা সম্পূর্ণভাবে প্রধানমন্ত্রীর মর্জির ওপর নির্ভর করে। তিনি চাইলে যেকোনো মন্ত্রীর দপ্তর পরিবর্তন করতে পারেন।ক্যাবিনেটের নেতৃত্ব: প্রধানমন্ত্রী ক্যাবিনেটের সভা ডাকেন এবং তাতে সভাপতিত্ব করেন। সভার আলোচ্যসূচি (Agenda) তিনিই স্থির করেন। কোনো মন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর গুরুতর মতবিরোধ হলে প্রধানমন্ত্রী তাঁকে পদত্যাগ করতে বলতে পারেন বা রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে তাঁকে বরখাস্ত করতে পারেন। প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের অর্থ হলো সমগ্র ক্যাবিনেটের পতন।
২. রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সম্পর্ক: সংবিধানের ৭৮ নম্বর ধারা অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী হলেন রাষ্ট্রপতি এবং মন্ত্রীপরিষদের মধ্যে যোগাযোগের একমাত্র প্রধান মাধ্যম।ক্যাবিনেটের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত এবং দেশের প্রশাসনিক ও আইন প্রণয়ন সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে জানাতে বাধ্য থাকেন।দেশের বিভিন্ন উচ্চপদস্থ আধিকারিক যেমন- অ্যাটর্নি জেনারেল, কম্প্রট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (CAG), নির্বাচন কমিশনার এবং রাষ্ট্রদূতদের নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীই রাষ্ট্রপতিকে আসল পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
৩. লোকসভা বা পার্লামেন্টের নেতা: প্রধানমন্ত্রী লোকসভার সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসেবে সমগ্র পার্লামেন্টের নেতৃত্ব প্রদান করেন।পার্লামেন্টে সরকারের প্রধান নীতি ও সিদ্ধান্তগুলি তিনিই ঘোষণা করেন।গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কে তিনি সরকারের হয়ে চূড়ান্ত জবাব দেন এবং বিরোধী দলের সমালোচনার মোকাবিলা করেন।পার্লামেন্টের অধিবেশন আহ্বান করা বা স্থগিত রাখার বিষয়ে তিনি রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শ দেন। পরিস্থিতি বিশেষে লোকসভার মেয়াদ শেষের আগেই তিনি সেটি ভেঙে দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ করতে পারেন।
৪. জাতীয় নেতা ও বৈদেশিক নীতি নির্ধারক: প্রধানমন্ত্রী কেবল তাঁর দলের নন, সমগ্র জাতির নেতা। দেশের যেকোনো বড় সংকট বা জরুরি পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ তাঁর বার্তার দিকে তাকিয়ে থাকে। এছাড়াও, ভারতের বৈদেশিক নীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নির্ধারণে তাঁর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। আন্তর্জাতিক চুক্তি, রাষ্ট্রসংঘে ভারতের অবস্থান এবং অন্যান্য দেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক তাঁরই সরাসরি তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়।
ক্ষমতার মূল্যায়ন ও সীমাবদ্ধতা: তাত্ত্বিকভাবে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা অসীম মনে হলেও, বাস্তবে তাঁকে বেশ কিছু সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে কাজ করতে হয়:
জোট সরকারের রাজনীতি: যদি কেন্দ্রে কোনো একটি দলের স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকে এবং কোয়ালিশন বা জোট সরকার গঠিত হয়, তবে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা অনেকটাই কমে যায়।তাকে জোট শরিকদের দাবিদাওয়া ও চাপের কাছে অনেক সময় নতিস্বীকার করতে হয়।
দলের অভ্যন্তরের চাপ: প্রধানমন্ত্রীকে সর্বদাই নিজের দলের প্রথম সারির নেতাদের সন্তুষ্ট রেখে চলতে হয়, নতুবা তাঁর নেতৃত্ব প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
জনমত ও বিরোধী দল: একটি গণতান্ত্রিক দেশে জনমত, সংবাদমাধ্যম এবং বিরোধী দলগুলির তীক্ষ্ণ নজরদারি প্রধানমন্ত্রীর একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথে সবচেয়ে বড় বাধা।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, ভারতের প্রধানমন্ত্রী কোনো স্বৈরাচারী শাসক নন, তিনি হলেন গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত এক শক্তিশালী জননেতা। তাঁর ব্যক্তিত্ব, রাজনৈতিক বিচক্ষণতা এবং জনসমর্থনের ওপরই তাঁর ক্ষমতার প্রকৃত পরিধি নির্ভর করে। একজন বলিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী যেমন দেশের প্রগতির মূল কান্ডারি হতে পারেন, তেমনই দুর্বল প্রধানমন্ত্রী দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণ হতে পারেন।
১৫। ভারতের প্রধান ধর্মাধিকরণের (সুপ্রিম কোর্টের) ক্ষমতা ও কার্যাবলী সম্পর্কে লেখো।
ভূমিকা: ভারতের সুপ্রিম কোর্ট কেবল দেশের সর্বোচ্চ আপিল আদালত নয়, এটি ভারতীয় সংবিধানের চূড়ান্ত ব্যাখ্যাকর্তা এবং অভিভাবক বা রক্ষাকর্তা হিসেবে কাজ করে। সংবিধান প্রণেতারা একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন যাতে আইনবিভাগ বা শাসনবিভাগ ক্ষমতার অপব্যবহার করে সংবিধানের পবিত্রতা নষ্ট করতে না পারে। সুপ্রিম কোর্ট তার বিভিন্ন ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে এই অভিভাবকত্বের দায়িত্ব পালন করে আসছে।
সংবিধানের অভিভাবক হিসেবে সুপ্রিম কোর্টের ভূমিকা: সুপ্রিম কোর্ট মূলত তিনটি প্রধান দিক থেকে সংবিধানের অভিভাবক হিসেবে তার দায়িত্ব পালন করে:
১. বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনা (Judicial Review):সংবিধানের অভিভাবক হিসেবে সুপ্রিম কোর্টের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার ক্ষমতা। সংসদ বা রাজ্য আইনসভার দ্বারা প্রণীত কোনো আইন কিংবা শাসনবিভাগের জারি করা কোনো নির্দেশিকা যদি সংবিধানের কোনো ধারার পরিপন্থী হয়, তবে সুপ্রিম কোর্ট তাকে 'অসাংবিধানিক' (Unconstitutional) বা অবৈধ বলে বাতিল করে দিতে পারে।১৯৭৩ সালের বিখ্যাত 'কেশবানন্দ ভারতী' মামলায় সুপ্রিম কোর্ট একটি ঐতিহাসিক রায় দেয়, যেখানে বলা হয় যে সংসদ ৩৬৮ নম্বর ধারা অনুযায়ী সংবিধান সংশোধন করতে পারলেও সংবিধানের 'মূল কাঠামো' (Basic Structure) কোনোভাবেই পরিবর্তন বা নষ্ট করতে পারবে না। এটি সংবিধানের সুরক্ষায় সুপ্রিম কোর্টের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পদক্ষেপ।
২. মৌলিক অধিকারের রক্ষাকর্তা: সংবিধানের তৃতীয় অংশে নাগরিকদের যে মৌলিক অধিকারগুলি দেওয়া হয়েছে, সুপ্রিম কোর্ট সেগুলির অতন্দ্র প্রহরী। ৩২ নম্বর ধারা অনুযায়ী, দেশের কোনো নাগরিকের মৌলিক অধিকার খর্ব হলে তিনি সরাসরি সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করতে পারেন। সুপ্রিম কোর্ট নাগরিকদের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য পাঁচ ধরনের রিট বা লেখ জারি করতে পারে (বন্দী প্রত্যক্ষীকরণ, পরমাদেশ, প্রতিষেধ, অধিকার পৃচ্ছা এবং উৎপ্রেষণ)। রাষ্ট্রের যেকোনো বেআইনি পদক্ষেপ থেকে সাধারণ মানুষকে বাঁচাতে সুপ্রিম কোর্ট সবসময় ঢাল হিসেবে কাজ করে।
৩. যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভারসাম্য রক্ষা: ভারত একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থার দেশ, যেখানে কেন্দ্র ও রাজ্যগুলির মধ্যে ক্ষমতার সুনির্দিষ্ট বিভাজন রয়েছে। ১৩১ নম্বর ধারা অনুযায়ী, কেন্দ্র ও রাজ্যগুলির মধ্যে কিংবা রাজ্যগুলির নিজেদের মধ্যে কোনো সাংবিধানিক বা আইনি বিরোধ দেখা দিলে, সুপ্রিম কোর্টই তার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করে। এর ফলে কোনো পক্ষই একে অপরের এক্তিয়ারে অনধিকার প্রবেশ করতে পারে না।
সমালোচনা (Criticism): সুপ্রিম কোর্টের এই অভিভাবক সুলভ ভূমিকার কিছু সমালোচনাও রয়েছে:
বিচার বিভাগীয় অতিসক্রিয়তা (Judicial Overreach): সমালোচকদের মতে, অনেক সময় জনস্বার্থ মামলার (PIL) নামে সুপ্রিম কোর্ট আইনবিভাগ ও শাসনবিভাগের দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজে অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ করে, যা গণতান্ত্রিক ক্ষমতার স্বতন্ত্রীকরণ নীতির পরিপন্থী।
অনির্বাচিত সংস্থা: বিচারপতিরা জনগণের দ্বারা সরাসরি নির্বাচিত নন, অথচ তাঁরা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের তৈরি করা আইন বাতিল করার ক্ষমতা রাখেন। এটি গণতান্ত্রিক মানসিকতার বিরোধী বলে অনেকেই মনে করেন।
বিলম্বিত ও ব্যয়বহুল বিচার: ভারতের বিচারব্যবস্থা অত্যন্ত জটিল, দীর্ঘমেয়াদি এবং সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে। লাখ লাখ মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে, যার ফলে "Justice delayed is justice denied" প্রবাদটি সত্য প্রমাণিত হয়। এই দীর্ঘসূত্রিতা অভিভাবক হিসেবে আদালতের কার্যকারিতাকে ম্লান করে দেয়।
উপসংহার: উক্ত সমালোচনাগুলি আংশিক সত্য হলেও, ভারতের গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোয় সুপ্রিম কোর্টের বিকল্প নেই। রাজনৈতিক দলগুলির ক্ষমতা কুক্ষিগত করার প্রবণতা এবং প্রশাসনিক স্বৈরাচারের হাত থেকে সংবিধানের মূল আদর্শগুলিকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্ট গত সাত দশক ধরে যে ভূমিকা পালন করেছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তাই সুপ্রিম কোর্টকে প্রকৃত অর্থেই ভারতীয় সংবিধানের অতন্দ্র প্রহরী ও অভিভাবক বলা চলে।
১৬। ভারতের কোনো একটি অঙ্গরাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর ক্ষমতা ও কার্যাবলীর মূল্যায়ন করো।
ভূমিকা: ভারতের সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় অঙ্গরাজ্যগুলির প্রশাসনিক কাঠামো মূলত কেন্দ্র সরকারেরই অনুরূপ। রাজ্যের শাসনতান্ত্রিক প্রধান হলেন রাজ্যপাল, কিন্তু তিনি কেবল নিয়মতান্ত্রিক বা নামসর্বস্ব প্রধান। রাজ্যের প্রকৃত শাসক এবং সরকার ব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি হলেন মুখ্যমন্ত্রী। সংবিধানের ১৬৩ এবং ১৬৪ নম্বর ধারা অনুযায়ী রাজ্যপালকে তাঁর কাজে সাহায্য ও পরামর্শ দেওয়ার জন্য মুখ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি মন্ত্রীপরিষদ থাকে। রাজ্যের বিধানসভার সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা বা নেত্রীকে রাজ্যপাল মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ করেন।
মুখ্যমন্ত্রীর ক্ষমতা ও কার্যাবলী: মুখ্যমন্ত্রীর ক্ষমতা অত্যন্ত ব্যাপক এবং বহুমুখী। তাঁর ক্ষমতা ও কাজগুলিকে কয়েকটি ভাগে আলোচনা করা যেতে পারে:
১. মন্ত্রীপরিষদ সংক্রান্ত ক্ষমতা: মুখ্যমন্ত্রী হলেন রাজ্য মন্ত্রীপরিষদের প্রধান স্রষ্টা এবং নিয়ন্ত্রক। মুখ্যমন্ত্রী তাঁর দলের বিধায়কদের মধ্য থেকে যোগ্য ব্যক্তিদের মন্ত্রী হিসেবে বেছে নেন এবং রাজ্যপালের কাছে তাঁদের নামের তালিকা পেশ করেন। মন্ত্রীদের মধ্যে বিভিন্ন দপ্তর (Portfolios) বণ্টন করা, দপ্তর পরিবর্তন করা এবং মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে সভাপতিত্ব করা তাঁর প্রধান কাজ। মুখ্যমন্ত্রী চাইলে যেকোনো মন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে বলতে পারেন। মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগের অর্থ হলো সমগ্র মন্ত্রীপরিষদের পতন। তাই তাঁকে ক্যাবিনেট তোরণের 'মূলভিত্তি' বা "Keystone of the Cabinet Arch" বলা হয়।
২. রাজ্যপালের সঙ্গে সম্পর্ক: মুখ্যমন্ত্রী হলেন রাজ্যপাল এবং মন্ত্রীপরিষদের মধ্যে যোগাযোগের প্রধান সেতুবন্ধন (১৬৭ নম্বর ধারা)। ক্যাবিনেটের যাবতীয় সিদ্ধান্ত তিনি রাজ্যপালকে অবহিত করেন। রাজ্যের শাসনকার্য এবং আইন প্রণয়নের বিষয়ে রাজ্যপাল কোনো তথ্য জানতে চাইলে মুখ্যমন্ত্রী তা জানাতে বাধ্য থাকেন। রাজ্যের অ্যাডভোকেট জেনারেল, রাজ্য পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সভাপতি ও সদস্যপদের নিয়োগের ক্ষেত্রে মুখ্যমন্ত্রীই রাজ্যপালকে আসল পরামর্শ দেন।
৩. রাজ্য আইনসভা বা বিধানসভার নেতা হিসেবে ভূমিকা: মুখ্যমন্ত্রী হলেন রাজ্য বিধানসভার সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা এবং সভার প্রধান মুখ। আইনসভার ভেতরে সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নীতি ও সিদ্ধান্ত তিনি ঘোষণা করেন। বিরোধী দলের প্রশ্নের জবাব দেওয়া এবং সরকারের ভাবমূর্তি বজায় রাখার দায়িত্ব মূলত তাঁর। বিধানসভার অধিবেশন ডাকা, স্থগিত রাখা বা প্রয়োজনবোধে মেয়াদ ফুরনোর আগেই বিধানসভা ভেঙে দেওয়ার জন্য তিনি রাজ্যপালকে পরামর্শ দিতে পারেন।
৪. রাজ্যের প্রধান শাসক ও দলের নেতা: মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যের সমগ্র প্রশাসনিক ব্যবস্থার শীর্ষে অবস্থান করেন। রাজ্যের শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা, জনকল্যাণমূলক নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন তাঁর অন্যতম দায়িত্ব। এছাড়া, তিনি তাঁর রাজনৈতিক দলেরও প্রধান মুখ। রাজ্যের মানুষের কাছে তাঁর ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি দলের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি করে।
ক্ষমতার মূল্যায়ন ও সীমাবদ্ধতা: তাত্ত্বিকভাবে মুখ্যমন্ত্রীর ক্ষমতা অত্যন্ত ব্যাপক মনে হলেও বাস্তবে এই ক্ষমতা অনেক বিষয়ের ওপর নির্ভর করে:
A.সংখ্যাগরিষ্ঠতার স্বরূপ: বিধানসভায় যদি মুখ্যমন্ত্রীর দলের একক ও নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকে, তবে তিনি অত্যন্ত শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে পারেন। কিন্তু যদি সরকার জোট সরকার (Coalition Government) হয়, তবে তাঁকে জোট শরিকদের চাপ এবং দাবিদাওয়া মেনে চলতে হয়, যা তাঁর স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে অনেক কমিয়ে দেয়।
B. দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের প্রভাব: সর্বভারতীয় রাজনৈতিক দলগুলির ক্ষেত্রে মুখ্যমন্ত্রীর ক্ষমতা অনেকাংশে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল থাকে।
C. রাজ্যপালের ভূমিকা: সংবিধানে রাজ্যপালকে কিছু 'স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা' দেওয়া হয়েছে। বিরোধী দলের সরকার থাকলে অনেক সময় রাজ্যপাল এবং মুখ্যমন্ত্রীর মধ্যে রাজনৈতিক সংঘাত দেখা যায়, যা রাজ্যের প্রশাসনে প্রভাব ফেলে। অনেক সময় ৩৫৬ নম্বর ধারা প্রয়োগ করে কেন্দ্র সরকার মুখ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকার ভেঙে দিতে পারে।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, একটি অঙ্গরাজ্যের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিকাঠামোয় মুখ্যমন্ত্রীর অবস্থান সূর্যের মতো, যাকে কেন্দ্র করে অন্যান্য গ্রহ রূপী মন্ত্রীরা আবর্তিত হয়। তাঁর ব্যক্তিত্ব, রাজনৈতিক বিচক্ষণতা এবং নেতৃত্বের গুণাবলির ওপরই একটি রাজ্যের সামগ্রিক উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা নির্ভর করে। সীমাবদ্ধতাগুলি সত্ত্বেও, রাজ্যের প্রকৃত নির্বাহী শাসক হিসেবে মুখ্যমন্ত্রীর ভূমিকা অপরিসীম।
