বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয় ভারতীয় সংবিধান (MDC 01) বিগত বছরের প্রশ্নোত্তর | Vidyasagar University - VU Indian Constitution PYQ & Notes in Bengali

Vidyasagar University-এর UG 1st Semester (CCFUP-NEP)-এর ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য এই পোস্টে Indian Constitution MDC 01 সিলেবাসের Previous Years’ Questions (PYQs) & Answers বাংলা ভাষায় (Bangla Notes) আলোচনা করা হলো।


স্নাতক প্রথম সেমিস্টার (Indian Constitution MDC 01) ভারতীয় সংবিধান — বিগত বছরের প্রশ্ন ও উত্তর
Vidyasagar University UG 1st Semester  Examination (NEP-CCFUP) 2023
Subject: Indian Constitution
Paper: MDC 1-T
Time: 2 Hours                                                                               Full Marks:40

বিভাগ ক * Group A * প্রতিটি প্রশ্নের মান ২ (যে-কোনো পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে)

১। ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের তাৎপর্য কি? 
(What is the significance of the Government of India Act 1935?)

উত্তর: ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন ভারতের সাংবিধানিক ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এই আইনের মাধ্যমেই প্রথমবার ভারতে একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয় এবং প্রদেশগুলিতে দ্বৈত শাসনের অবসান ঘটিয়ে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা করা হয়। বর্তমান ভারতীয় সংবিধানের একটি বিশাল অংশ, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা, রাজ্যপালের ক্ষমতা এবং প্রশাসনিক পরিকাঠামো, এই আইন থেকেই সরাসরি বা পরোক্ষভাবে গ্রহণ করা হয়েছে।

২। কখন ভারতের সংবিধান গৃহীত হয়েছিল?
(When was the Indian Constitution adopted?)

উত্তর: স্বাধীন ভারতের সংবিধান ১৯৪৯ সালের ২৬শে নভেম্বর গণপরিষদ বা সংবিধান সভা দ্বারা চূড়ান্তভাবে গৃহীত হয়েছিল। তবে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়েছিল ঠিক দুই মাস পর, অর্থাৎ ১৯৫০ সালের ২৬শে জানুয়ারি থেকে, যে বিশেষ দিনটিকে আমরা প্রতি বছর প্রজাতন্ত্র দিবস হিসেবে পালন করে থাকি।

৩। ভারতের সংবিধানের ১৪ ধারা বর্ণনা কর।
(Describe Article 14 of the Indian Constitution.)

উত্তর: ভারতের সংবিধানের ১৪ নম্বর ধারাটি নাগরিকদের সাম্যের অধিকারের কথা সুনিশ্চিত করে, যা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। এই ধারা অনুযায়ী, ভারতের ভূখণ্ডের মধ্যে রাষ্ট্র কোনো ব্যক্তিকে আইনের দৃষ্টিতে সমতা বা আইনের সমান সংরক্ষণ থেকে বঞ্চিত করতে পারবে না। এর সহজ অর্থ হলো, ধর্ম, জাতি, বর্ণ, লিঙ্গ বা জন্মস্থান নির্বিশেষে দেশের প্রতিটি নাগরিক আইনের চোখে সম্পূর্ণ সমান এবং প্রত্যেকে সমান আইনি সুরক্ষা পাওয়ার সমান অধিকারী।

৪। নিবর্তনমূলক আটক আইন কি?
(What is Preventive Detention Act?)

উত্তর: নিবর্তনমূলক আটক আইন বা প্রিভেন্টিভ ডিটেনশন হলো এমন একটি বিশেষ আইন যার অধীনে কোনো ব্যক্তিকে অপরাধ করার আগেই, কেবল অপরাধ করার প্রবল সন্দেহের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার করে আটকে রাখা যায়। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষা, জনশৃঙ্খলা বজায় রাখা বা বৈদেশিক সম্পর্ক বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা থাকলে প্রশাসন এই চরম পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে। এই আইনের মূল উদ্দেশ্য কোনো ব্যক্তিকে তার অতীত অপরাধের জন্য শাস্তি দেওয়া নয়, বরং ভবিষ্যৎ সম্ভাব্য অপরাধমূলক কাজ থেকে তাকে বিরত রাখা।

৫। ভারতীয় সংবিধানের কোন্ অংশে রাষ্ট্র পরিচালনার নির্দেশমূলক নীতি উল্লেখ করা হয়েছে?
(In which part of the Indian Constitution are the Directive Principles of State Policy mentioned?)

উত্তর: ভারতীয় সংবিধানের চতুর্থ অংশে বা পার্ট ফোর-এ (Part IV) রাষ্ট্র পরিচালনার নির্দেশমূলক নীতিসমূহ বা ডিরেকটিভ প্রিন্সিপালস অফ স্টেট পলিসি বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই নীতিগুলি সংবিধানের ৩৬ নম্বর ধারা থেকে শুরু করে ৫১ নম্বর ধারার মধ্যে সন্নিবেশিত রয়েছে। আয়ারল্যান্ডের সংবিধানের অনুকরণে এই নীতিগুলি ভারতের সংবিধানে যুক্ত করা হয়েছে, যার মূল উদ্দেশ্য হলো দেশে একটি প্রকৃত কল্যাণকামী বা ওয়েলফেয়ার রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা।

৬। রাজ্যসভার সদস্য হওয়ার যোগ্যতা কি?
(What are the qualifications to become a member of the Rajya Sabha?)

উত্তর: সংসদের উচ্চকক্ষ বা রাজ্যসভার সদস্য হতে গেলে প্রার্থীকে সর্বপ্রথম অবশ্যই ভারতের নাগরিক হতে হবে এবং তার বয়স কমপক্ষে ৩০ বছর পূর্ণ হতে হবে। এছাড়া, সংসদ কর্তৃক প্রণীত অন্য যেকোনো আইনি যোগ্যতা তার থাকা প্রয়োজন এবং তিনি সরকার বা রাষ্ট্রের অধীনে কোনো লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত থাকতে পারবেন না। প্রার্থীকে মানসিকভাবে সুস্থ হতে হবে এবং কোনো আদালত দ্বারা দেউলিয়া বা গুরুতর অপরাধী হিসেবে ঘোষিত হওয়া চলবে না।

৭। ভারতীয় সংসদের কোন্ কক্ষ প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে গঠিত?
(Which house of the Indian Parliament is formed on the basis of representation?)


উত্তর: ভারতীয় সংসদের নিম্নকক্ষ, অর্থাৎ লোকসভা সরাসরি জনগণের প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে গঠিত হয়। এই কক্ষের সদস্যরা দেশের প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকদের দ্বারা প্রত্যক্ষ ভোটাধিকারের মাধ্যমে সরাসরি নির্বাচিত হয়ে সংসদে আসেন। লোকসভাকে তাই জনগণের কক্ষ বা হাউস অফ দ্য পিপল বলা হয়ে থাকে, যা ভারতের গণতান্ত্রিক ও প্রতিনিধিত্বমূলক শাসনব্যবস্থার সবচেয়ে বড় প্রতিফলন।

৮। রাজ্যপাল পদের জন্য কে যোগ্য?
(Who is eligible for the post of Governor?)


উত্তর: রাজ্যের নিয়মতান্ত্রিক প্রধান বা রাজ্যপাল পদের জন্য যোগ্য হতে গেলে একজন ব্যক্তিকে অবশ্যই জন্মসূত্রে বা অন্যভাবে ভারতের নাগরিক হতে হবে এবং তার বয়স কমপক্ষে ৩৫ বছর পূর্ণ হতে হবে। তিনি কেন্দ্রীয় সংসদ বা রাজ্য আইনসভার কোনো কক্ষের সদস্য হিসেবে থাকতে পারবেন না এবং সরকারের অধীন কোনো আর্থিক লাভজনক পদে যুক্ত থাকতে পারবেন না। এছাড়া তিনি যে রাজ্যের রাজ্যপাল নিযুক্ত হবেন, সাধারণত সেই রাজ্যের স্থায়ী বাসিন্দা না হওয়াটাই একটি অলিখিত রাজনৈতিক প্রথা হিসেবে ভারতবর্ষে মেনে চলা হয়।

বিভাগ খ * Group B * প্রতিটি প্রশ্নের মান ৫ (যে-কোনো দুইটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে)

৯। ভারতের সংবিধানের প্রস্তাবনার তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো।
(Explain the significance of the Preamble of the Indian Constitution.)


উত্তর: ভারতের সংবিধানের প্রস্তাবনা হলো সমগ্র সংবিধানের একটি দর্শনীয় দর্পণ বা মুখবন্ধ, যা সংবিধান প্রণেতাদের মূল চিন্তাধারা, উদ্দেশ্য এবং আদর্শকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে সংক্ষেপে তুলে ধরে। এর রাজনৈতিক, নৈতিক এবং আইনি তাৎপর্য অপরিসীম।প্রথমত, প্রস্তাবনাটি শুরু হয়েছে 'আমরা, ভারতের জনগণ' এই ঐতিহাসিক শব্দগুচ্ছ দিয়ে। এর গভীর তাৎপর্য হলো, এটি প্রমাণ করে যে ভারতের বর্তমান সংবিধানের চূড়ান্ত উৎস এবং সমস্ত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রকৃত অধিকারী হলেন ভারতের সাধারণ জনগণ। এটি ব্রিটিশ সরকার বা অন্য কোনো বহিরাগত শক্তি অথবা মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের দ্বারা ভারতীয়দের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়নি, বরং ভারতীয়রা নিজেদের জন্য স্বাধীনভাবে এই সংবিধান রচনা করেছেন।

দ্বিতীয়ত, প্রস্তাবনা ভারতকে একটি সার্বভৌম, সমাজতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক, সাধারণতন্ত্র হিসেবে সমগ্র বিশ্বের কাছে ঘোষণা করে। সার্বভৌমত্ব বলতে বোঝায় ভারত তার অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক সমস্ত বিষয়ে সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং কোনো বিদেশি শক্তির অধীনে নয়। সমাজতান্ত্রিক এবং ধর্মনিরপেক্ষ শব্দ দুটি মূল সংবিধানে ছিল না, ১৯৭৬ সালে ৪২তম সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে এগুলো যুক্ত করা হয়, যা দেশের সম্পদের সুষম বণ্টন, শোষণহীন সমাজ গঠন এবং সব ধর্মের প্রতি রাষ্ট্রের সমান ও নিরপেক্ষ আচরণের দৃঢ় প্রতিশ্রুতি দেয়। গণতান্ত্রিক ও সাধারণতন্ত্র কথার প্রকৃত অর্থ হলো দেশের সরকার প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের ভিত্তিতে জনগণের দ্বারা নির্বাচিত হবে এবং রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ প্রধান (রাষ্ট্রপতি) হবেন একজন পরোক্ষভাবে নির্বাচিত ব্যক্তি, তিনি কোনো বংশানুক্রমিক রাজা বা রানী নন।

তৃতীয়ত, প্রস্তাবনা দেশের সকল নাগরিকের জন্য সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ন্যায়বিচার সুনিশ্চিত করার স্পষ্ট কথা বলে। এটি প্রতিটি মানুষের চিন্তা, মতপ্রকাশ, বিশ্বাস, ধর্ম এবং উপাসনার মৌলিক স্বাধীনতার নিশ্চয়তা প্রদান করে। এছাড়া, সমাজের সকলের জন্য মর্যাদা ও সুযোগের সম্পূর্ণ সমতা প্রতিষ্ঠা করা এবং বৈচিত্র্যময় নাগরিকদের মধ্যে গভীর ভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে তুলে দেশের ঐক্য ও সংহতি অটুট রাখা প্রস্তাবনার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

আইনগত দিক থেকে বিচার করলে, প্রস্তাবনা সরাসরি কোনো আদালতে বলবৎযোগ্য না হলেও, সুপ্রিম কোর্ট বিভিন্ন ঐতিহাসিক মামলায়, বিশেষ করে কেশবানন্দ ভারতী মামলায় (১৯৭৩) রায় দিয়েছে যে প্রস্তাবনা হলো সংবিধানের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। যখনই সংবিধানের কোনো নির্দিষ্ট ধারার অর্থ নিয়ে বা আইনগত অস্পষ্টতা দেখা দেয়, তখন বিচারপতিরা প্রস্তাবনায় নিহিত আদর্শের সাহায্য গ্রহণ করেন। তাই প্রস্তাবনাকে ভারতীয় সংবিধানের আত্মা এবং চাবিকাঠি হিসেবে গণ্য করা হয়, যা স্বাধীন ভারতের সামগ্রিক রাষ্ট্রীয় চরিত্র এবং ভবিষ্যৎ লক্ষ্যমাত্রার একটি নিখুঁত চিত্র তুলে ধরে।

১০। ভারতীয় নাগরিকদের মৌলিক কর্তব্য সম্পর্কে লেখো।
(Write about the fundamental duties of Indian citizens.)


উত্তর
: ভারতীয় সংবিধানে দেশের নাগরিকদের অধিকার রক্ষার জন্য যেমন মৌলিক অধিকারের বিস্তৃত নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে, ঠিক তেমনি দেশ ও সমাজের প্রতি তাদের কিছু অবশ্য পালনীয় দায়িত্ব বা কর্তব্যের কথাও সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, যা ভারতীয় সংবিধানে মৌলিক কর্তব্য বা ফান্ডামেন্টাল ডিউটিজ হিসেবে পরিচিত। ১৯৫০ সালে যখন মূল সংবিধান কার্যকর হয়, তখন এই মৌলিক কর্তব্যগুলির কোনো উল্লেখ ছিল না। পরবর্তীকালে ১৯৭৬ সালে সরণ সিং কমিটির ঐতিহাসিক সুপারিশের ভিত্তিতে ৪২তম গুরুত্বপূর্ণ সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের চতুর্থ-ক অংশে অর্থাৎ পার্ট ফোর-এ (Part IVA) এবং ৫১-ক (51A) নম্বর ধারায় মোট ১০টি মৌলিক কর্তব্য যুক্ত করা হয়। পরে ২০০২ সালে ৮৬তম সংশোধনীর মাধ্যমে আরও একটি নতুন কর্তব্য যুক্ত হওয়ায় বর্তমানে ভারতীয় নাগরিকদের মোট মৌলিক কর্তব্যের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১টি। প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের সংবিধানের আদর্শ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এই ধারণাটি ভারতের সংবিধানে গ্রহণ করা হয়েছিল।

ভারতীয় নাগরিকদের প্রধান ১১টি মৌলিক কর্তব্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো:
A) দেশের সর্বোচ্চ আইন অর্থাৎ সংবিধানকে নিষ্ঠার সঙ্গে মান্য করা এবং সংবিধানের মহান আদর্শ, বিভিন্ন জাতীয় প্রতিষ্ঠানসমূহ, জাতীয় পতাকা ও জাতীয় সঙ্গীতের প্রতি যথাযথ সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা।

B) যে মহান স্বাধীনতা সংগ্রাম আমাদের দেশকে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করেছিল, সেই সংগ্রামের মহান আদর্শগুলিকে সর্বদা স্মরণ ও অনুসরণ করা।

C) ভারতের সার্বভৌমত্ব, জাতীয় ঐক্য ও সংহতিকে সর্বদা অটুট রাখা এবং তাকে সযত্নে রক্ষা করা।

D) প্রয়োজনবোধে দেশরক্ষার কাজে অংশগ্রহণ করা এবং জাতীয় সেবার ডাক পেলে নিঃস্বার্থভাবে সাড়া দেওয়া।

E) ধর্ম, ভাষা, অঞ্চল বা অন্য কোনো ভেদাভেদ সম্পূর্ণ ভুলে গিয়ে দেশের সব মানুষের মধ্যে ঐক্য, সম্প্রীতি ও গভীর ভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে তোলা এবং নারীর মর্যাদা হানিকর যে কোনো অশুভ প্রথাগুলি অবিলম্বে বর্জন করা।

F) দেশের অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও মিশ্র সংস্কৃতির ঐতিহ্যকে সম্মান করা ও তার সংরক্ষণ করা।

G) বনভূমি, হ্রদ, নদী, বন্যপ্রাণীসহ সমগ্র প্রাকৃতিক পরিবেশের সংরক্ষণ ও উন্নতিসাধন করা এবং প্রতিটি জীবজগতের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করা।

H) নাগরিকদের মধ্যে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি, মানবতাবাদ এবং অনুসন্ধিৎসা ও সংস্কারমুখী উন্নত মনোভাব গড়ে তোলা কর্তব্য।

I) দেশের যাবতীয় সরকারি বা জাতীয় সম্পত্তি সযত্নে রক্ষা করা এবং সব ধরনের সহিংসতা থেকে নিজেকে দূরে রাখাও এর অন্তর্ভুক্ত।

J) ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত সব ধরনের কাজে চরম উৎকর্ষের দিকে নিরন্তর এগিয়ে যাওয়া, যাতে দেশ প্রগতি ও উন্নতির সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছাতে পারে।

    সর্বশেষ এবং একাদশ কর্তব্যটি হলো, ৬ থেকে ১৪ বছর বয়সী প্রত্যেক শিশুকে শিক্ষার প্রাথমিক সুযোগ করে দেওয়া, যা প্রত্যেক পিতা-মাতা বা অভিভাবকের অবশ্য পালনীয় দায়িত্ব। এই মৌলিক কর্তব্যগুলি আইন দ্বারা সরাসরি আদালতে বলবৎযোগ্য না হলেও, এগুলো হলো সুনাগরিক হিসেবে দেশের প্রতি দায়িত্ব পালনের নৈতিক নির্দেশিকা।


১১। ভারতীয় রাষ্ট্রপতির জরুরি ক্ষমতা সম্পর্কে আলোচনা করো।
(Discuss the emergency powers of the Indian President.)


উত্তর
: ভারতের সংবিধানে যেকোনো ধরনের আকস্মিক বিপদ, জাতীয় সংকট বা অস্বাভাবিক পরিস্থিতি দ্রুত ও কার্যকরভাবে মোকাবিলা করার জন্য দেশের রাষ্ট্রপতিকে অত্যন্ত ব্যাপক ও বিশেষ কিছু ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে, যা সাংবিধানিক পরিভাষায় জরুরি ক্ষমতা নামে সুপরিচিত। সংবিধানের অষ্টাদশ অংশে (Part XVIII) ৩৫২ থেকে ৩৬০ নম্বর ধারার মধ্যে এই জরুরি ক্ষমতাগুলির বিস্তারিত আইনি বিবরণ দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রপতির এই জরুরি ক্ষমতাকে প্রধানত তিনটি সুনির্দিষ্ট ভাগে ভাগ করা যায়: জাতীয় জরুরি অবস্থা, রাজ্যে শাসনতান্ত্রিক অচলাবস্থাজনিত জরুরি অবস্থা বা রাষ্ট্রপতি শাসন এবং আর্থিক জরুরি অবস্থা।

প্রথমত, জাতীয় জরুরি অবস্থা (National Emergency), যার উল্লেখ রয়েছে সংবিধানের ৩৫২ নম্বর ধারায়। যদি রাষ্ট্রপতির দৃঢ়ভাবে মনে হয় যে যুদ্ধ, বিদেশি রাষ্ট্রের বহিরাক্রমণ অথবা দেশের অভ্যন্তরে ব্যাপক সশস্ত্র বিদ্রোহের ফলে সমগ্র ভারতের বা দেশের কোনো বিশেষ অংশের নিরাপত্তা চরমভাবে বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, তবে তিনি জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে পারেন। তবে রাষ্ট্রপতি নিজের ইচ্ছায় এটি করতে পারেন না, কেবলমাত্র প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন ক্যাবিনেটের লিখিত পরামর্শেই তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করতে পারেন। জাতীয় জরুরি অবস্থা চলাকালীন ভারতের শাসনব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে এককেন্দ্রিক রূপ ধারণ করে, রাজ্য সরকারগুলির ক্ষমতা সংকুচিত হয় এবং নাগরিকদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক অধিকার, বিশেষ করে ১৯ নম্বর ধারার স্বাধীনতার অধিকারগুলি সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা যেতে পারে।

দ্বিতীয়ত, রাজ্যে শাসনতান্ত্রিক অচলাবস্থাজনিত জরুরি অবস্থা (State Emergency), যা ৩৫৬ নম্বর ধারায় বর্ণিত এবং সাধারণত রাষ্ট্রপতি শাসন নামে অধিক পরিচিত। কোনো রাজ্যের রাজ্যপালের কাছ থেকে পাঠানো রিপোর্ট পেয়ে বা অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির যদি মনে হয় যে সেই নির্দিষ্ট রাজ্যের সরকার সংবিধানের নিয়ম ও বিধান অনুযায়ী আর স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারছে না, তখন তিনি সেই রাজ্যে জরুরি অবস্থা জারি করতে পারেন। এই অবস্থা ঘোষণা হলে সংশ্লিষ্ট রাজ্যের নির্বাচিত সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয় এবং রাজ্যের সম্পূর্ণ শাসনভার সরাসরি রাষ্ট্রপতি বা তার প্রতিনিধি হিসেবে নিযুক্ত রাজ্যপালের হাতে চলে যায়। তখন রাজ্যের আইনসভা ভেঙে দেওয়া হতে পারে বা সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়।

তৃতীয়ত, আর্থিক জরুরি অবস্থা (Financial Emergency), যা ৩৬০ নম্বর ধারায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতির যদি মনে হয় যে সমগ্র দেশে এমন একটি ভয়ানক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে যার ফলে ভারতের বা তার কোনো নির্দিষ্ট অংশের আর্থিক স্থায়িত্ব বা আন্তর্জাতিক সুনাম চরমভাবে বিপন্ন হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে, তখন তিনি আর্থিক জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে পারেন। এই বিশেষ অবস্থা চলাকালীন কেন্দ্র সরকার যেকোনো রাজ্যকে তাদের আর্থিক বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিতে পারে। এমনকী সুপ্রিম কোর্ট বা হাইকোর্টের বিচারপতি সহ যেকোনো সরকারি কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা হ্রাস করার অসীম ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে থাকে। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে আজ পর্যন্ত একবারও আর্থিক জরুরি অবস্থা জারি করার প্রয়োজন হয়নি।


১২। ভারতের ক্যাবিনেট ব্যবস্থা সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত টীকা লেখো।
(Write a short note on the Cabinet system of India.)


উত্তর
: ভারতের সংসদীয় গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় ব্রিটিশ সংসদীয় রীতির প্রত্যক্ষ অনুকরণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্যাবিনেট ব্যবস্থার সফল প্রবর্তন করা হয়েছে। ভারতীয় সংবিধানের ৭৪ নম্বর ধারায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে দেশের নিয়মতান্ত্রিক প্রধান অর্থাৎ রাষ্ট্রপতিকে তার যাবতীয় শাসনতান্ত্রিক কাজে সাহায্য ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী মন্ত্রীপরিষদ থাকবে। এই সমগ্র মন্ত্রীপরিষদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, অত্যন্ত শক্তিশালী এবং নীতি নির্ধারক ক্ষুদ্রতম অংশটিই হলো ক্যাবিনেট। মূলত প্রধানমন্ত্রী এবং শীর্ষস্থানীয় গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত অভিজ্ঞ পূর্ণমন্ত্রীদের নিয়েই এই ক্যাবিনেট গঠিত হয়। ক্যাবিনেট হলো ভারত সরকারের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারক ও নির্বাহী সংস্থা। সরকারের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক, দেশীয় রাজনৈতিক এবং বৈদেশিক বা আন্তর্জাতিক নীতি ক্যাবিনেটের রুদ্ধদ্বার বৈঠকেই চূড়ান্তভাবে গৃহীত হয়। তাত্ত্বিকভাবে দেশের সমস্ত শাসনতান্ত্রিক এবং প্রশাসনিক ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যস্ত থাকলেও, বাস্তবে রাষ্ট্রপতি হলেন নামসর্বস্ব প্রধান। তিনি সর্বদাই ক্যাবিনেটের পরামর্শ অনুযায়ী সেই সমস্ত ক্ষমতা প্রয়োগ করে থাকেন। অর্থাৎ, ক্যাবিনেটই হলো ভারতের প্রকৃত শাসনতান্ত্রিক ক্ষমতার একমাত্র অধিকারী। ক্যাবিনেটের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে সাধারণত অন্যান্য রাষ্ট্রমন্ত্রী বা উপমন্ত্রীরা উপস্থিত থাকেন না, কেবল পূর্ণমন্ত্রীরাই এখানে অংশগ্রহণ করার অধিকারী। প্রধানমন্ত্রী হলেন এই ক্যাবিনেটের অবিসংবাদিত প্রধান নেতা, যিনি প্রতিটি বৈঠকের সভাপতিত্ব করেন এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রকের কাজের মধ্যে সুনির্দিষ্ট সমন্বয় সাধন করেন।

         এই ক্যাবিনেট ব্যবস্থার একটি অন্যতম প্রধান ও মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো এর যৌথ দায়িত্বশীলতা। সংবিধানের ৭৫(৩) নম্বর ধারা অনুযায়ী সমগ্র মন্ত্রীপরিষদ তাদের যাবতীয় কাজের জন্য যৌথভাবে লোকসভার কাছে দায়ী থাকতে বাধ্য থাকে। এর প্রকৃত অর্থ হলো, ক্যাবিনেটের নেওয়া কোনো একটি সিদ্ধান্তের জন্য শুধু সেই সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে দায়ী থাকেন না, বরং সমগ্র সরকার ও ক্যাবিনেট যৌথভাবে দায়ী থাকে। যদি লোকসভায় সরকারের আনা কোনো বিল বাতিল হয়ে যায় বা বিরোধী দলের আনা অনাস্থা প্রস্তাব পাস হয়ে যায়, তবে পুরো ক্যাবিনেট তথা সমগ্র সরকারকে একযোগে পদত্যাগ করতে হয়। ক্যাবিনেটের সদস্যরা সর্বদা একে অপরের কাজে সহযোগিতা করেন এবং কোনো অবস্থাতেই জনসমক্ষে সরকারের বা ক্যাবিনেটের কোনো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তের সমালোচনা করতে পারেন না।দেশের আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রেও ক্যাবিনেটের ভূমিকা অত্যন্ত নির্ণায়ক। ভারতীয় সংসদে উত্থাপিত বেশিরভাগ গুরুত্বপূর্ণ এবং নীতিগত সরকারি বিল মূলত ক্যাবিনেট দ্বারাই প্রথম অনুমোদিত ও সতর্কতার সঙ্গে প্রস্তুত হয়। দেশের বার্ষিক সাধারণ বাজেট, পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা এবং কর সংক্রান্ত যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রেও ক্যাবিনেটের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই শেষ কথা বলে গণ্য হয়। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদাধিকারীদের নিয়োগের ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রপতি মূলত ক্যাবিনেটের দেওয়া পরামর্শ মেনেই চূড়ান্ত নিয়োগপত্র স্বাক্ষর করেন। সংক্ষেপে বলতে গেলে, ক্যাবিনেট হলো সমগ্র ভারতীয় শাসনযন্ত্রের মূল চালিকাশক্তি।


বিভাগ গ * Group C * প্রতিটি প্রশ্নের মান ১০ (যে-কোনো দুইটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে)

১৩। ভারতের সংবিধান তৈরিতে সংবিধান সভার ভূমিকার পর্যালোচনা করো।
(Discuss the role of the Constituent Assembly in the framing of the Constitution of India.)


ভূমিকা: ভারতের বর্তমান সংবিধান কোনো এক দিনে বা কোনো একক ব্যক্তির দ্বারা রচিত হয়নি। এটি স্বাধীন ভারতের রূপকারদের দীর্ঘকালের চিন্তা, নিরলস পরিশ্রম এবং ব্যাপক আলাপ-আলোচনার এক চূড়ান্ত ফসল। ১৯৪৬ সালের 'ক্যাবিনেট মিশন' বা মন্ত্রী মিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী ভারতের জন্য একটি নতুন সংবিধান রচনার উদ্দেশ্যে 'সংবিধান সভা' বা 'গণপরিষদ' (Constituent Assembly) গঠিত হয়। প্রায় তিন বছর (২ বছর, ১১ মাস, ১৮ দিন) ধরে সংবিধান সভার অক্লান্ত পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে ভারতের এই ঐতিহাসিক ও সুবৃহৎ লিখিত সংবিধানটি পরিণতি লাভ করে।

সংবিধান সভার গঠন ও প্রাথমিক কার্যাবলী: ১৯৪৬ সালের জুলাই মাসে সংবিধান সভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। মূলত প্রাদেশিক আইনসভার সদস্যদের দ্বারা পরোক্ষভাবে গণপরিষদের সদস্যরা নির্বাচিত হয়েছিলেন। প্রথমদিকে এর সদস্য সংখ্যা ছিল ৩৮৯ জন, কিন্তু দেশভাগের পর মুসলিম লীগের সদস্যরা গণপরিষদ ত্যাগ করলে সদস্য সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ২৯৯ জন। ১৯৪৬ সালের ৯ ডিসেম্বর ডঃ সচ্চিদানন্দ সিনহার সভাপতিত্বে সংবিধান সভার প্রথম অধিবেশন বসে এবং ১১ ডিসেম্বর ডঃ রাজেন্দ্র প্রসাদ গণপরিষদের স্থায়ী সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন।

উদ্দেশ্যমূলক প্রস্তাব (Objectives Resolution): সংবিধান সভার কাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় ছিল পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু কর্তৃক উত্থাপিত 'উদ্দেশ্যমূলক প্রস্তাব'। ১৯৪৬ সালের ১৩ ডিসেম্বর নেহরু এই প্রস্তাব উত্থাপন করেন, যেখানে ভারতের ভবিষ্যৎ রূপরেখা কেমন হবে তা স্পষ্ট করা হয়। ভারতকে একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও সাধারণতন্ত্র হিসেবে গড়ে তোলা, নাগরিকদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ন্যায়বিচার প্রদান করা এবং মৌলিক অধিকার সুনিশ্চিত করার কথা এই প্রস্তাবে বলা হয়েছিল। ১৯৪৭ সালের ২২ জানুয়ারি প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয় এবং এটিই পরবর্তীকালে সংবিধানের প্রস্তাবনার (Preamble) ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।

বিভিন্ন কমিটি ও খসড়া কমিটির ভূমিকা: সংবিধান রচনার সুবিধার জন্য গণপরিষদ মোট ২২টি কমিটি গঠন করেছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল ডঃ বি. আর. আম্বেদকরের সভাপতিত্বে গঠিত 'খসড়া কমিটি' (Drafting Committee)। ১৯৪৭ সালের ২৯ আগস্ট গঠিত এই কমিটির প্রধান দায়িত্ব ছিল অন্যান্য কমিটিগুলির রিপোর্টের ভিত্তিতে সংবিধানের একটি পূর্ণাঙ্গ খসড়া প্রস্তুত করা। ডঃ আম্বেদকরের অসাধারণ আইনি পাণ্ডিত্য, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা এবং অক্লান্ত পরিশ্রমের কারণে তাঁকে 'ভারতীয় সংবিধানের জনক' বলা হয়।

বিতর্ক, আলোচনা ও বিভিন্ন দেশের সংবিধানের প্রভাব: সংবিধান সভার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল এর গণতান্ত্রিক কর্মপদ্ধতি। প্রতিটি ধারা নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিতর্ক ও সমালোচনা হয়েছিল। গণপরিষদের সদস্যরা ব্রিটেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, আয়ারল্যান্ড, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি দেশের সংবিধান গভীরভাবে অধ্যয়ন করেন এবং সেসব দেশের সংবিধানের সেরা দিকগুলি ভারতের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গ্রহণ করেন। উদাহরণস্বরূপ, সংসদীয় শাসনব্যবস্থা নেওয়া হয় ব্রিটেন থেকে এবং মৌলিক অধিকারের ধারণা নেওয়া হয় আমেরিকা থেকে।


পর্যালোচনা ও সমালোচনা: সংবিধান সভার ভূমিকা অপরিসীম হলেও, এর কিছু সমালোচনা রয়েছে:
১. সার্বভৌমিকতার অভাব: সমালোচকদের মতে, সংবিধান সভা ব্রিটিশ সরকারের ক্যাবিনেট মিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী গঠিত হয়েছিল, তাই এটি সম্পূর্ণ সার্বভৌম প্রতিষ্ঠান ছিল না।
২. সর্বজনীন ভোটাধিকারের অভাব:  গণপরিষদের সদস্যরা সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের ভিত্তিতে সরাসরি জনগণের দ্বারা নির্বাচিত হননি, যা এর প্রতিনিধিত্বমূলক চরিত্রকে কিছুটা ক্ষুণ্ণ করে।
৩.কংগ্রেসের আধিপত্য: গণপরিষদে জাতীয় কংগ্রেসের একচেটিয়া আধিপত্য ছিল। গ্র্যানভিল অস্টিন বলেছিলেন, "গণপরিষদ ছিল কংগ্রেস এবং কংগ্রেসই ছিল ভারত।"
৪.আইনজীবীদের প্রাধান্য: সংবিধানে ব্যবহৃত ভাষা অত্যন্ত জটিল ও আইনানুগ হওয়ার কারণে একে 'আইনজীবীদের স্বর্গরাজ্য' বলা হয়।

উপসংহার:  উপরিউক্ত সমালোচনাগুলি সত্ত্বেও ভারতের সংবিধান রচনায় সংবিধান সভার অবদান অনস্বীকার্য। তৎকালীন অস্থির রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির মধ্যে দাঁড়িয়ে একটি বৈচিত্র্যময় দেশের জন্য এমন একটি শক্তিশালী সংবিধান রচনা করা কোনো সহজ কাজ ছিল না। সংবিধান সভার সদস্যরা অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে দেশের ঐক্য, সংহতি এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন, যার প্রমাণ হলো গত সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে ভারতীয় সংবিধানের সফল কার্যকারিতা।

১৪। ভারতীয় সংবিধানে বর্ণিত ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার সম্পর্কে লেখো।


ভূমিকা:
ভারত একটি বহু ধর্ম, বহু ভাষা ও সংস্কৃতির বৈচিত্র্যময় দেশ। দেশের এই অখণ্ডতা ও বৈচিত্র্য বজায় রাখার জন্য সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতাকে অন্যতম মূল স্তম্ভ হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। ১৯৭৬ সালে ৪২তম সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে প্রস্তাবনায় স্পষ্টভাবে 'ধর্মনিরপেক্ষ' (Secular) শব্দটি যুক্ত করা হলেও, মূল সংবিধানের তৃতীয় অংশে (Part III) মৌলিক অধিকারের অধ্যায়ে ২৫ থেকে ২৮ নম্বর ধারায় নাগরিকদের 'ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার' অত্যন্ত বিস্তৃতভাবে আলোচনা করা হয়েছে।

২৫ নম্বর ধারা: বিবেকের স্বাধীনতা এবং ধর্মাচরণের অধিকার: 
সংবিধানের ২৫(১) নম্বর ধারায় বলা হয়েছে যে, জনশৃঙ্খলা (Public order), নৈতিকতা (Morality) এবং জনস্বাস্থ্যের (Health) শর্ত সাপেক্ষে ভারতের প্রতিটি ব্যক্তি স্বাধীনভাবে নিজের বিবেক অনুযায়ী যে-কোনো ধর্ম গ্রহণ করার, ধর্ম পালন করার এবং নিজ ধর্ম প্রচার করার সমান অধিকার ভোগ করবেন।তবে, এই অধিকার অবাধ নয়। ২৫(২) ধারা অনুযায়ী রাষ্ট্র চাইলে সামাজিক সংস্কারের উদ্দেশ্যে আইন প্রণয়ন করতে পারে। এছাড়া, ধর্মের নামে কোনো অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক বা ধর্মনিরপেক্ষ কাজকে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

২৬ নম্বর ধারা: ধর্মীয় কার্যাবলী পরিচালনার স্বাধীনতা:  এই ধারায় মূলত ব্যক্তিবিশেষের পরিবর্তে ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলির অধিকারের কথা বলা হয়েছে। জনশৃঙ্খলা, স্বাস্থ্য ও নৈতিকতা বজায় রেখে প্রতিটি ধর্মীয় সম্প্রদায় বা গোষ্ঠী কয়েকটি বিশেষ অধিকার ভোগ করবে:
১. ধর্মীয় ও দাতব্য উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠান স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণের অধিকার।
২. নিজ ধর্মের অভ্যন্তরীণ বিষয়াদি স্বাধীনভাবে পরিচালনার অধিকার।
৩. স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি অর্জন এবং মালিকানা লাভের অধিকার।
৪. আইনের দ্বারা ওই সম্পত্তি পরিচালনার অধিকার।

২৭ নম্বর ধারা: ধর্ম প্রসারের জন্য কর প্রদানে বাধ্য না করার অধিকার: সংবিধানের ২৭ নম্বর ধারায় সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের প্রসার বা রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কোনো ব্যক্তিকে কোনো প্রকার চাঁদা বা কর (Tax) প্রদানে বাধ্য করা যাবে না। রাষ্ট্র সকল নাগরিকদের কাছ থেকে সংগৃহীত করের অর্থ কোনো একটি নির্দিষ্ট ধর্মের উন্নতির জন্য ব্যয় করতে পারবে না। রাষ্ট্রের কাছে সব ধর্মই সমান। তবে রাষ্ট্র কর না নিলেও, নির্দিষ্ট কোনো তীর্থস্থানের রক্ষণাবেক্ষণ বা তীর্থযাত্রীদের বিশেষ সুবিধা প্রদানের জন্য ফি (Fee) ধার্য করতে পারে।

২৮ নম্বর ধারা: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় শিক্ষা সংক্রান্ত স্বাধীনতা:  এই ধারায় সরকারি ও সরকার-পোষিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে ধর্মীয় শিক্ষার বিষয়ে নিয়মকানুন বলা হয়েছে:

১. সম্পূর্ণভাবে সরকারি অর্থে পরিচালিত কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোনো প্রকার ধর্মীয় শিক্ষা প্রদান করা যাবে না।
২. তবে, কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যদি রাষ্ট্র দ্বারা পরিচালিত হয় কিন্তু কোনো ধর্মীয় ট্রাস্ট বা সংস্থার দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয় (যেখানে ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়া বাধ্যতামূলক), তবে সেখানে ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়া যেতে পারে।
৩. রাষ্ট্র কর্তৃক আংশিক সাহায্যপ্রাপ্ত বা সরকার অনুমোদিত কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যদি ধর্মীয় উপাসনা বা শিক্ষার ব্যবস্থা থাকে, তবে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীর সম্মতি ছাড়া (বা নাবালক হলে তার অভিভাবকের সম্মতি ছাড়া) তাকে সেই শিক্ষায় অংশগ্রহণ করতে বাধ্য করা যাবে না।

মূল্যায়ন ও উপসংহার:  ভারতীয় সংবিধানে বর্ণিত ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। পাশ্চাত্যের ধর্মনিরপেক্ষতায় যেমন রাষ্ট্র ধর্ম থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকে, ভারতে তেমনটা নয়। ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতা হলো "সর্ব ধর্ম সমভাব"—অর্থাৎ রাষ্ট্র সব ধর্মকে সমান চোখে দেখবে এবং সব ধর্মের প্রতি নিরপেক্ষ থাকবে। একইসঙ্গে, ধর্মের নামে হওয়া কোনো কুপ্রথা বা অমানবিক আচরণ (যেমন: অস্পৃশ্যতা বা সতীদাহ প্রথার মতো প্রাচীন কুসংস্কার) দূর করতে রাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করতে পারে। এই অধিকারগুলি নিশ্চিত করে যে, ভারতে ধর্ম পালনের স্বাধীনতা থাকলেও ধর্মের নামে কেউ রাষ্ট্রের আইন বা সামাজিক শৃঙ্খলার ঊর্ধ্বে উঠতে পারবে না।

১৫। ভারতের প্রধান ধর্মাধিকরণের (সুপ্রিম কোর্টের) ক্ষমতা ও কার্যাবলী সম্পর্কে লেখো।


ভূমিকা:

ভারতের প্রধান ধর্মাধিকরণ বা সুপ্রিম কোর্ট হলো দেশের সর্বোচ্চ বিচারালয় এবং ভারতীয় সংবিধানের অভিভাবক ও রক্ষাকর্তা। ভারতীয় সংবিধানের পঞ্চম অংশে (Part V) ১২৪ থেকে ১৪৭ নম্বর ধারার মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের গঠন, ক্ষমতা ও কার্যাবলী বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে বিরোধ নিষ্পত্তি এবং নাগরিকদের মৌলিক অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্ট এক অতুলনীয় ভূমিকা পালন করে।

সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতা ও কার্যাবলী:  সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতাকে প্রধানত চারটি মূল এলাকা বা এখতিয়ারে (Jurisdiction) ভাগ করা যায়। নিচে এগুলি আলোচনা করা হলো:
১. মূল এলাকা (Original Jurisdiction):
সংবিধানের ১৩১ নম্বর ধারা অনুযায়ী, কিছু নির্দিষ্ট মামলার বিচার সরাসরি সুপ্রিম কোর্টেই শুরু হতে পারে, অন্য কোনো নিম্ন আদালতে নয়। এর মধ্যে পড়ে:
A. ভারত সরকার এবং এক বা একাধিক রাজ্যের মধ্যে বিরোধ।
B. একদিকে ভারত সরকার ও কোনো রাজ্য এবং অন্যদিকে এক বা একাধিক রাজ্যের মধ্যে আইনি বিরোধ।
C. দুই বা ততোধিক অঙ্গরাজ্যের মধ্যে যেকোনো আইনি বা সাংবিধানিক বিরোধ। (তবে আন্তঃরাজ্য জলবণ্টন বা অর্থকমিশন সংক্রান্ত বিষয়গুলি এই এলাকার বাইরে থাকে)।

২. আপিল এলাকা (Appellate Jurisdiction):  সুপ্রিম কোর্ট হলো ভারতের সর্বোচ্চ আপিল আদালত। হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে মূলত চার ধরনের আপিল এখানে করা যায়:

A. সাংবিধানিক আপিল (১৩২ নং ধারা): হাইকোর্ট যদি এই মর্মে শংসাপত্র দেয় যে, কোনো মামলায় সংবিধানের ব্যাখ্যামূলক কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন জড়িত আছে, তবে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করা যায়।
B. দেওয়ানি আপিল (১৩৩ নং ধারা):  দেওয়ানি বা সিভিল মামলায় হাইকোর্ট যদি মনে করে যে তাতে কোনো সাধারণ আইনের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আছে, তাহলে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করা চলে।
C. ফৌজদারি আপিল (১৩৪ নং ধারা): হাইকোর্ট যদি নিম্ন আদালতের খালাস পাওয়া কোনো আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেয় বা নিম্ন আদালতের মামলা নিজের হাতে তুলে নিয়ে আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেয়, তবে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করা অধিকার হিসেবে গণ্য হয়।
D. বিশেষ অনুমতির মাধ্যমে আপিল (১৩৬ নং ধারা): সামরিক ট্রাইব্যুনাল ছাড়া ভারতের যেকোনো আদালত বা ট্রাইব্যুনালের যেকোনো রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্ট নিজের বিশেষ ক্ষমতাবলে আপিলের অনুমতি (Special Leave Petition) দিতে পারে।

৩. পরামর্শদান এলাকা (Advisory Jurisdiction):  ১৪৩ নম্বর ধারা অনুযায়ী, ভারতের রাষ্ট্রপতি যদি মনে করেন যে আইন বা তথ্য সংক্রান্ত এমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দেখা দিয়েছে যা ব্যাপক জনস্বার্থের সঙ্গে জড়িত, তবে তিনি সুপ্রিম কোর্টের কাছে আইনি পরামর্শ চাইতে পারেন। সুপ্রিম কোর্ট বিষয়টি বিবেচনা করে রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শ দেয়। তবে রাষ্ট্রপতি এই পরামর্শ মানতে বাধ্য নন এবং সুপ্রিম কোর্টও সব ক্ষেত্রে পরামর্শ দিতে বাধ্য থাকে না।

৪. লেখ জারি করার ক্ষমতা (Writ Jurisdiction): ৩২ নম্বর ধারা অনুযায়ী, দেশের নাগরিকদের মৌলিক অধিকারগুলি খর্ব হলে তা পুনরুদ্ধার করার জন্য সুপ্রিম কোর্ট পাঁচ ধরনের লেখ বা রিট জারি করতে পারে। এগুলি হলো: বন্দী প্রত্যক্ষীকরণ (Habeas Corpus), পরমাদেশ (Mandamus), প্রতিষেধ (Prohibition), অধিকার পৃচ্ছা (Quo-Warranto), এবং উৎপ্রেষণ (Certiorari)।

অন্যান্য ক্ষমতা (Other Powers): 

আদালতের নথিপত্র সংরক্ষক (Court of Record): ১২৯ নং ধারা অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্ট 'কোর্ট অফ রেকর্ড' হিসেবে কাজ করে। এর সমস্ত রায় ও সিদ্ধান্ত চিরস্থায়ী দলিল হিসেবে সংরক্ষিত হয় এবং দেশের সব আদালত তা নজির হিসেবে মান্য করে। কেউ সুপ্রিম কোর্টকে অবমাননা করলে এই আদালত তাকে শাস্তি দিতে পারে।
বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনা (Judicial Review): সুপ্রিম কোর্ট সংসদ বা রাজ্য আইনসভার দ্বারা প্রণীত যেকোনো আইন বা প্রশাসনিক নির্দেশকে সংবিধান-বিরোধী মনে হলে তা বাতিল বা 'অসাংবিধানিক' ঘোষণা করতে পারে।

উপসংহার:  উপসংহারে বলা যায়, সুপ্রিম কোর্ট কেবল একটি আইনি প্রতিষ্ঠান নয়, এটি ভারতীয় গণতন্ত্রের অন্যতম রক্ষাকবচ। নাগরিকদের অধিকার রক্ষা থেকে শুরু করে সংবিধানের চূড়ান্ত ব্যাখ্যা প্রদান এবং প্রশাসনিক স্বৈরাচার রোধ করতে সুপ্রিম কোর্ট অত্যন্ত সক্রিয় ও শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে আসছে।

১৬। ভারতের কোনো একটি অঙ্গরাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর ক্ষমতা ও কার্যাবলীর মূল্যায়ন করো।


ভূমিকা:  ভারতের সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় অঙ্গরাজ্যগুলির প্রশাসনিক কাঠামো মূলত কেন্দ্র সরকারেরই অনুরূপ। রাজ্যের শাসনতান্ত্রিক প্রধান হলেন রাজ্যপাল, কিন্তু তিনি কেবল নিয়মতান্ত্রিক বা নামসর্বস্ব প্রধান। রাজ্যের প্রকৃত শাসক এবং সরকার ব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি হলেন মুখ্যমন্ত্রী। সংবিধানের ১৬৩ এবং ১৬৪ নম্বর ধারা অনুযায়ী রাজ্যপালকে তাঁর কাজে সাহায্য ও পরামর্শ দেওয়ার জন্য মুখ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি মন্ত্রীপরিষদ থাকে। রাজ্যের বিধানসভার সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা বা নেত্রীকে রাজ্যপাল মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ করেন।

মুখ্যমন্ত্রীর ক্ষমতা ও কার্যাবলী:  মুখ্যমন্ত্রীর ক্ষমতা অত্যন্ত ব্যাপক এবং বহুমুখী। তাঁর ক্ষমতা ও কাজগুলিকে কয়েকটি ভাগে আলোচনা করা যেতে পারে:

১. মন্ত্রীপরিষদ সংক্রান্ত ক্ষমতা:   মুখ্যমন্ত্রী হলেন রাজ্য মন্ত্রীপরিষদের প্রধান স্রষ্টা এবং নিয়ন্ত্রক। মুখ্যমন্ত্রী তাঁর দলের বিধায়কদের মধ্য থেকে যোগ্য ব্যক্তিদের মন্ত্রী হিসেবে বেছে নেন এবং রাজ্যপালের কাছে তাঁদের নামের তালিকা পেশ করেন। মন্ত্রীদের মধ্যে বিভিন্ন দপ্তর (Portfolios) বণ্টন করা, দপ্তর পরিবর্তন করা এবং মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে সভাপতিত্ব করা তাঁর প্রধান কাজ। মুখ্যমন্ত্রী চাইলে যেকোনো মন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে বলতে পারেন। মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগের অর্থ হলো সমগ্র মন্ত্রীপরিষদের পতন। তাই তাঁকে ক্যাবিনেট তোরণের 'মূলভিত্তি' বা "Keystone of the Cabinet Arch" বলা হয়।

২. রাজ্যপালের সঙ্গে সম্পর্ক:  মুখ্যমন্ত্রী হলেন রাজ্যপাল এবং মন্ত্রীপরিষদের মধ্যে যোগাযোগের প্রধান সেতুবন্ধন (১৬৭ নম্বর ধারা)। ক্যাবিনেটের যাবতীয় সিদ্ধান্ত তিনি রাজ্যপালকে অবহিত করেন।  রাজ্যের শাসনকার্য এবং আইন প্রণয়নের বিষয়ে রাজ্যপাল কোনো তথ্য জানতে চাইলে মুখ্যমন্ত্রী তা জানাতে বাধ্য থাকেন।  রাজ্যের অ্যাডভোকেট জেনারেল, রাজ্য পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সভাপতি ও সদস্যপদের নিয়োগের ক্ষেত্রে মুখ্যমন্ত্রীই রাজ্যপালকে আসল পরামর্শ দেন।

৩. রাজ্য আইনসভা বা বিধানসভার নেতা হিসেবে ভূমিকা:  মুখ্যমন্ত্রী হলেন রাজ্য বিধানসভার সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা এবং সভার প্রধান মুখ।  আইনসভার ভেতরে সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নীতি ও সিদ্ধান্ত তিনি ঘোষণা করেন।  বিরোধী দলের প্রশ্নের জবাব দেওয়া এবং সরকারের ভাবমূর্তি বজায় রাখার দায়িত্ব মূলত তাঁর।  বিধানসভার অধিবেশন ডাকা, স্থগিত রাখা বা প্রয়োজনবোধে মেয়াদ ফুরনোর আগেই বিধানসভা ভেঙে দেওয়ার জন্য তিনি রাজ্যপালকে পরামর্শ দিতে পারেন।

৪. রাজ্যের প্রধান শাসক ও দলের নেতা:  মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যের সমগ্র প্রশাসনিক ব্যবস্থার শীর্ষে অবস্থান করেন। রাজ্যের শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা, জনকল্যাণমূলক নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন তাঁর অন্যতম দায়িত্ব। এছাড়া, তিনি তাঁর রাজনৈতিক দলেরও প্রধান মুখ। রাজ্যের মানুষের কাছে তাঁর ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি দলের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি করে।

ক্ষমতার মূল্যায়ন ও সীমাবদ্ধতা:  তাত্ত্বিকভাবে মুখ্যমন্ত্রীর ক্ষমতা অত্যন্ত ব্যাপক মনে হলেও বাস্তবে এই ক্ষমতা অনেক বিষয়ের ওপর নির্ভর করে:

A.সংখ্যাগরিষ্ঠতার স্বরূপ:  বিধানসভায় যদি মুখ্যমন্ত্রীর দলের একক ও নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকে, তবে তিনি অত্যন্ত শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে পারেন। কিন্তু যদি সরকার জোট সরকার (Coalition Government) হয়, তবে তাঁকে জোট শরিকদের চাপ এবং দাবিদাওয়া মেনে চলতে হয়, যা তাঁর স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে অনেক কমিয়ে দেয়।

B. দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের প্রভাব:  সর্বভারতীয় রাজনৈতিক দলগুলির ক্ষেত্রে মুখ্যমন্ত্রীর ক্ষমতা অনেকাংশে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল থাকে। 

C. রাজ্যপালের ভূমিকা: সংবিধানে রাজ্যপালকে কিছু 'স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা' দেওয়া হয়েছে। বিরোধী দলের সরকার থাকলে অনেক সময় রাজ্যপাল এবং মুখ্যমন্ত্রীর মধ্যে রাজনৈতিক সংঘাত দেখা যায়, যা রাজ্যের প্রশাসনে প্রভাব ফেলে। অনেক সময় ৩৫৬ নম্বর ধারা প্রয়োগ করে কেন্দ্র সরকার মুখ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকার ভেঙে দিতে পারে।

উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, একটি অঙ্গরাজ্যের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিকাঠামোয় মুখ্যমন্ত্রীর অবস্থান সূর্যের মতো, যাকে কেন্দ্র করে অন্যান্য গ্রহ রূপী মন্ত্রীরা আবর্তিত হয়। তাঁর ব্যক্তিত্ব, রাজনৈতিক বিচক্ষণতা এবং নেতৃত্বের গুণাবলির ওপরই একটি রাজ্যের সামগ্রিক উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা নির্ভর করে। সীমাবদ্ধতাগুলি সত্ত্বেও, রাজ্যের প্রকৃত নির্বাহী শাসক হিসেবে মুখ্যমন্ত্রীর ভূমিকা অপরিসীম।


ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য কিছু প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQs)

১. বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (VU) MDC 1-T ভারতীয় সংবিধান (Indian Constitution) পেপারের বিগত বছরের প্রশ্ন (PYQs) সলভ করা কেন জরুরি?

উত্তর: বিগত ৩-৫ বছরের প্রশ্নপত্র সমাধান করলে পরীক্ষার প্রশ্নের ধরন এবং কোন টপিকগুলো থেকে বারবার প্রশ্ন আসে, সে সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়। বিশেষ করে নতুন CCFUP (NEP 2020) কারিকুলামে কোন অধ্যায়গুলো বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তা বুঝতে PYQs-এর কোনো বিকল্প নেই।

উত্তর: সাধারণত বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী, ২ নম্বরের প্রশ্নের (বিভাগ ক) উত্তর ২-৩টি বাক্যে (সর্বোচ্চ ৪০-৫০ শব্দ), ৫ নম্বরের প্রশ্নের (বিভাগ খ) উত্তর ১৫০-২০০ শব্দের মধ্যে এবং ১০ নম্বরের প্রশ্নের (বিভাগ গ) উত্তর ৩০০-৪০০ শব্দের মধ্যে লেখা উচিত। তবে শব্দের চেয়ে উত্তরের গুণমান এবং সঠিক পয়েন্টের ওপর বেশি জোর দেওয়া প্রয়োজন।

উত্তর: বাধ্যতামূলক নয়, তবে ৫ এবং ১০ নম্বরের ব্রড প্রশ্নের ক্ষেত্রে প্যারাগ্রাফ করে লেখার চেয়ে পয়েন্ট (Points) ও সাব-পয়েন্ট (Sub-points) দিয়ে লিখলে নম্বর অনেক ভালো ওঠে। উত্তরের শুরুতে একটি প্রাসঙ্গিক ভূমিকা (Introduction) এবং শেষে একটি উপসংহার (Conclusion) দিলে খাতার মান বৃদ্ধি পায়।

উত্তর: হ্যাঁ, আপনি আপনার সুবিধামতো বাংলা অথবা ইংরেজি—যেকোনো একটি ভাষায় সম্পূর্ণ পেপারের উত্তর লিখতে পারেন। তবে একই পেপারে কিছু উত্তর বাংলায় এবং কিছু উত্তর ইংরেজিতে লেখা উচিত নয় (Technical terms ছাড়া)।

উত্তর: বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের MDC 1-T ভারতীয় সংবিধান (Indian Constitution) পেপারের সম্পূর্ণ আপডেটেড সিলেবাস এবং সেমিস্টার অনুযায়ী স্টাডি মেটেরিয়ালস ও নোটস পেতে আমাদের ওয়েবসাইটের 'সিলেবাস' এবং 'নোটস' সেকশনে ভিজিট করতে পারো। এছাড়াও টপিক-ভিত্তিক ভিডিও আলোচনার জন্য Polity Politics ইউটিউব চ্যানেলটি দেখতে পারো।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন:

Facebook WhatsApp Telegram

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top