বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয় UG 2nd Sem VAC 02 হিউম্যান রাইটস / মানবাধিকার কোর্সের বিগত বছরের সেমিস্টার পরীক্ষার প্রশ্নোত্তর
(Vidyasagar University VAC 2 Human Rights Solved PYQ)
বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করার জন্য বিগত বছরের প্রশ্ন (PYQ) সমাধান করা অত্যন্ত জরুরি। অনেক সময়ই আগের বছরের প্রশ্ন পরীক্ষায় পুনরাবৃত্তি (repeat) হয়।
নিচে বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ভ্যালু অ্যাডেড কোর্স’ (VAC 2) – মানবাধিকার বা Human Rights পেপারের পূর্ববর্তী সেমিস্টারান্তিক (Semester End) পরীক্ষার ২ নম্বরের সংক্ষিপ্ত প্রশ্নগুলির সহজ ও সঠিক উত্তর দেওয়া হলো।আগামী পরীক্ষার চূড়ান্ত প্রস্তুতির জন্য এই প্রশ্নোত্তরগুলি মনোযোগ সহকারে পড়ে নেওয়া প্রয়োজন।
প্রশ্নোত্তর (Question-Answer)
VU 2nd Semester Examination 2025
বিভাগ খ – Group B প্রতিটি প্রশ্নের মান ৫
১২.মানবাধিকারের শ্রেণিবিভাগ করো। (Classification of Human Rights)
ভূমিকা:
মানবাধিকার হলো সেই সমস্ত সহজাত এবং মৌলিক অধিকার, যা একজন মানুষের সুস্থ, স্বাভাবিক এবং মর্যাদাপূর্ণভাবে বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য। মানবাধিকারের পরিধি অত্যন্ত বিস্তৃত হওয়ায় রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং আন্তর্জাতিক আইনে একে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা হয়েছে।
মানবাধিকারের সবচেয়ে আধুনিক ও সর্বজনগ্রাহ্য শ্রেণিবিভাগটি করেছেন বিশিষ্ট ফরাসি আইনজ্ঞ কারেল ভাসাক (Karel Vasak) ১৯৭৯ সালে। তিনি ফরাসি বিপ্লবের তিনটি মূল আদর্শ—’স্বাধীনতা, সাম্য ও মৈত্রী’ (Liberty, Equality, and Fraternity)-এর ওপর ভিত্তি করে মানবাধিকারকে ‘তিনটি প্রজন্মে’ (Three Generations) বিভক্ত করেছেন।
নিম্নে মানবাধিকারের প্রধান শ্রেণিবিভাগগুলি আলোচনা করা হলো:
১. প্রথম প্রজন্মের মানবাধিকার: পৌর ও রাজনৈতিক অধিকার (Civil and Political Rights)
ফরাসি বিপ্লবের ‘স্বাধীনতা’ (Liberty)-এর আদর্শ থেকে এই অধিকারগুলোর উৎপত্তি। এই অধিকারগুলির মূল লক্ষ্য হলো রাষ্ট্রের স্বৈরাচারী ক্ষমতার হাত থেকে ব্যক্তির স্বাধীনতাকে রক্ষা করা। এগুলো প্রধানত ‘নেতিবাচক’ প্রকৃতির। অর্থাৎ, এই অধিকারগুলো ভোগ করার জন্য রাষ্ট্রকে কেবল ব্যক্তির স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকতে হয়। ১৯৪৮ সালের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার (UDHR) ৩ থেকে ২১ নম্বর ধারায় এই অধিকারগুলির উল্লেখ রয়েছে।
উদাহরণ: জীবনের অধিকার (Right to Life), বাক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা (Freedom of Speech and Expression), স্বাধীনভাবে ধর্ম পালনের অধিকার (Right to Religion), ভোটাধিকার এবং নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অধিকার
২. দ্বিতীয় প্রজন্মের মানবাধিকার: অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার (Economic, Social and Cultural Rights)
ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন এবং ফরাসি বিপ্লবের ‘সাম্য’ (Equality)-এর আদর্শ থেকে এই অধিকারগুলোর জন্ম। এর মূল লক্ষ্য হলো মানুষের আর্থ-সামাজিক নিরাপত্তা ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করা। এগুলো ‘ইতিবাচক’ প্রকৃতির। অর্থাৎ, এই অধিকারগুলো সুনিশ্চিত করার জন্য রাষ্ট্রকে সক্রিয় উদ্যোগ নিতে হয় এবং পরিকাঠামো গড়তে হয় (যেমন— বিদ্যালয়, হাসপাতাল তৈরি করা)। UDHR-এর ২২ থেকে ২৭ নম্বর ধারায় এই অধিকারগুলিকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
উদাহরণ: কাজের অধিকার ও সমান কাজের জন্য সমান মজুরির অধিকার (Right to Work), শিক্ষার অধিকার (Right to Education), পর্যাপ্ত বাসস্থান ও স্বাস্থ্যের অধিকার (Right to Health), সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার (Social Security)
৩. তৃতীয় প্রজন্মের মানবাধিকার: সংহতিমূলক বা সমষ্টিগত অধিকার (Solidarity or Collective Rights)
বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে, মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফরাসি বিপ্লবের ‘মৈত্রী’ বা ভ্রাতৃত্ববোধ (Fraternity)-এর আদর্শ থেকে এই অধিকারগুলোর উদ্ভব। এগুলো কোনো একক ব্যক্তির নিজস্ব অধিকার নয়, বরং সমগ্র বিশ্ব সম্প্রদায় বা গোষ্ঠীর অধিকার। বর্তমান যুগের বিশ্বায়নের প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক সহযোগিতা ছাড়া এই অধিকারগুলি রক্ষা করা সম্ভব নয়। এটি আন্তর্জাতিক সংহতির ওপর নির্ভরশীল।
উদাহরণ: সুস্থ ও দূষণমুক্ত পরিবেশের অধিকার (Right to a Clean Environment), সার্বিক উন্নয়নের অধিকার (Right to Development), আন্তর্জাতিক শান্তির অধিকার (Right to Peace), আদিবাসী এবং সংখ্যালঘুদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার
অন্যান্য দৃষ্টিকোণ থেকে শ্রেণিবিভাগ:
কারেল ভাসাকের তত্ত্ব ছাড়াও মানবাধিকারকে আরও দুটি সাধারণ ভাগে ভাগ করা যায়:
A. নেতিবাচক অধিকার (Negative Rights): যে অধিকারগুলো রাষ্ট্রকে কোনো কাজ করা থেকে বিরত রাখে (যেমন— বিনা বিচারে আটকে না রাখার অধিকার)।
B. ইতিবাচক অধিকার (Positive Rights): যে অধিকারগুলো রাষ্ট্রকে নির্দিষ্ট সুযোগ-সুবিধা প্রদানে বাধ্য করে (যেমন— বিনামূল্যে প্রাথমিক শিক্ষার অধিকার)।
উপসংহার:
মানবাধিকারের এই প্রজন্মভিত্তিক শ্রেণিবিভাগগুলি মূলত আলোচনার সুবিধার্থে এবং ঐতিহাসিক বিবর্তনের ভিত্তিতে করা হয়েছে। বাস্তবে, মানবাধিকারকে একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না। ১৯৯৩ সালের ভিয়েনা মানবাধিকার সম্মেলনে (Vienna Declaration) স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, “সকল মানবাধিকার সার্বজনীন, অবিভাজ্য এবং পরস্পর নির্ভরশীল” (All human rights are universal, indivisible and interdependent)। অর্থাৎ, নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার ছাড়া যেমন অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়, তেমনি অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ছাড়া রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্থহীন।
বিভাগ গ – Group C প্রতিটি প্রশ্নের মান 10
১৩. ১৯৬৬ সালের পৌর ও রাজনৈতিক অধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তির একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ দাও। (International Covenant on Civil and Political Rights – ICCPR, 1966)
ভূমিকা:
১৯৪৮ সালে রাষ্ট্রসংঘের ‘মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র’ (UDHR) গৃহীত হলেও, আইনগতভাবে তা রাষ্ট্রগুলির ওপর বাধ্যতামূলক ছিল না। তাই মানবাধিকারকে আইনি কাঠামোতে আনার জন্য রাষ্ট্রসংঘ দুটি আন্তর্জাতিক চুক্তির খসড়া তৈরি করে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ‘পৌর ও রাজনৈতিক অধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি’ (ICCPR)। ১৯৬৬ সালের ১৬ই ডিসেম্বর রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ সভায় এই চুক্তিটি গৃহীত হয় এবং ১৯৭৬ সালের ২৩শে মার্চ থেকে এটি আন্তর্জাতিক স্তরে কার্যকর হয়।
এই চুক্তিটি মূলত ফরাসি বিপ্লবের ‘স্বাধীনতা’ এবং প্রথম প্রজন্মের মানবাধিকারের ধারণাগুলির ওপর ভিত্তি করে তৈরি।
চুক্তির গঠন (Structure of the Covenant):
এই চুক্তিতে একটি প্রস্তাবনা এবং মোট ৫৩টি ধারা (Articles) রয়েছে, যা ৬টি ভাগে (Parts) বিভক্ত। এই চুক্তির মূল লক্ষ্য হলো রাষ্ট্রের স্বৈরাচারী ক্ষমতার হাত থেকে নাগরিকের ব্যক্তি স্বাধীনতাকে রক্ষা করা।
চুক্তির প্রধান অধিকারসমূহ (Key Provisions):
চুক্তির তৃতীয় ভাগে (Part III, ধারা ৬-২৭) নাগরিকদের জন্য বেশ কিছু মৌলিক পৌর ও রাজনৈতিক অধিকারের কথা বলা হয়েছে। উল্লেখযোগ্য অধিকারগুলি হলো:
১. জীবনের অধিকার (Right to Life – ধারা ৬): প্রতিটি মানুষের বেঁচে থাকার জন্মগত অধিকার রয়েছে। কোনো ব্যক্তিকে বেআইনি বা খামখেয়ালিভাবে তার জীবন থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।
২. নির্যাতন থেকে মুক্তি (Freedom from Torture – ধারা ৭): কাউকে শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন করা যাবে না। এছাড়া, সম্মতি ছাড়া কারোর ওপর চিকিৎসা সংক্রান্ত বা বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
৩. দাসত্ব ও বেগার খাটার ওপর নিষেধাজ্ঞা (Freedom from Slavery – ধারা ৮): সব ধরনের দাসপ্রথা, মানুষ পাচার এবং জোরপূর্বক শ্রম (Forced labor) এই চুক্তিতে সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
৪. ব্যক্তি স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা (Liberty and Security of Person – ধারা ৯): কাউকে বেআইনিভাবে গ্রেপ্তার বা আটকে রাখা যাবে না। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিকে অবিলম্বে গ্রেপ্তারের কারণ জানাতে হবে এবং দ্রুত বিচারের জন্য আদালতে পেশ করতে হবে।
৫. স্বাধীনভাবে চলাফেরা ও বসবাসের অধিকার (Freedom of Movement – ধারা ১২): প্রতিটি ব্যক্তির নিজের দেশের সীমানার মধ্যে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করার এবং নিজের ইচ্ছেমতো বাসস্থান বেছে নেওয়ার অধিকার রয়েছে।
৬. আইনি সমতা ও ন্যায়বিচারের অধিকার (Right to a Fair Trial – ধারা ১৪): আইনের চোখে সবাই সমান। অপরাধের অভিযোগ উঠলে প্রত্যেকের একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচারবিভাগীয় ট্রাইব্যুনালে দ্রুত ও প্রকাশ্য বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে।
৭. ধর্ম, বিবেক ও চিন্তার স্বাধীনতা (Freedom of Thought and Religion – ধারা ১৮): প্রত্যেক ব্যক্তির স্বাধীনভাবে চিন্তা করার, বিবেক অনুযায়ী চলার এবং নিজের পছন্দমতো ধর্ম গ্রহণ ও পালন করার অধিকার রয়েছে।
৮. মতপ্রকাশ ও সমাবেশের স্বাধীনতা (Freedom of Expression and Assembly – ধারা ১৯ ও ২১):প্রতিটি ব্যক্তির স্বাধীনভাবে নিজের মতামত প্রকাশের অধিকার রয়েছে (যদিও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বা জনশৃঙ্খলার স্বার্থে এতে যুক্তিসঙ্গত বিধিনিষেধ আরোপ করা যেতে পারে)। এছাড়া শান্তিপূর্ণভাবে সমবেত হওয়ার অধিকারকেও স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
৯. রাজনৈতিক অধিকার (Political Rights – ধারা ২৫): প্রত্যেক নাগরিকের দেশের শাসন পরিচালনায় অংশ নেওয়ার, সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে ভোট দেওয়ার এবং নির্বাচিত হওয়ার অধিকার রয়েছে।
পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োগ প্রক্রিয়া (Implementation Mechanism):
চুক্তির চতুর্থ ভাগে (ধারা ২৮-৪৫) অধিকারগুলি বাস্তবায়নের তদারকি করার জন্য একটি ‘মানবাধিকার কমিটি’ (Human Rights Committee) গঠনের কথা বলা হয়েছে। ১৮ জন নিরপেক্ষ মানবাধিকার বিশেষজ্ঞকে নিয়ে এই কমিটি গঠিত হয়। সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে নিয়মিতভাবে (সাধারণত প্রতি ৪ বছর অন্তর) এই কমিটির কাছে রিপোর্ট জমা দিতে হয় যে তারা চুক্তির শর্তাবলী কতটা পালন করছে।
ঐচ্ছিক প্রোটোকল (Optional Protocols):
এই চুক্তির সাথে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ‘ঐচ্ছিক প্রোটোকল’ যুক্ত রয়েছে:
প্রথম ঐচ্ছিক প্রোটোকল (১৯৬৬): এর মাধ্যমে কোনো দেশের নাগরিক যদি মনে করেন যে রাষ্ট্র তার অধিকার লঙ্ঘন করেছে, তবে তিনি সরাসরি রাষ্ট্রসংঘের মানবাধিকার কমিটির কাছে ব্যক্তিগত স্তরে অভিযোগ (Individual Complaints) জানাতে পারেন।
দ্বিতীয় ঐচ্ছিক প্রোটোকল (১৯৮৯): এই প্রোটোকলটির মূল লক্ষ্য হলো সদস্য রাষ্ট্রগুলোতে ‘মৃত্যুদণ্ড’ (Death Penalty) সম্পূর্ণভাবে বাতিল করা।
উপসংহার (Conclusion):
মানবাধিকারের ইতিহাসে ১৯৬৬ সালের এই চুক্তির গুরুত্ব অপরিসীম। ১৯৪৮ সালের UDHR, ১৯৬৬ সালের ICCPR এবং অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার সংক্রান্ত চুক্তি (ICESCR)—এই তিনটিকে একত্রে ‘আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদ’ (International Bill of Human Rights) বলা হয়। ভারত ১৯৭৯ সালে এই চুক্তিতে (ICCPR) স্বাক্ষর করে অনুমোদন দেয়। এই চুক্তি শুধু নাগরিকদের স্বাধীনতাকে সুরক্ষিত করেনি, বরং আন্তর্জাতিক স্তরে মানবাধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি করেছে।
